চট্টগ্রাম বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০

ভাঙছে হেফাজতে ইসলাম!

৬ জুলাই, ২০২০ | ১:৪৪ অপরাহ্ণ

নাজিম মুহাম্মদ

ভাঙছে হেফাজতে ইসলাম!

ভাঙছে হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশ। সরকারকে ঝাঁকুনি দিয়ে রাতারাতি প্রতিষ্ঠিত হেফাজতের পুরো নিয়ন্ত্রণ যাচ্ছে সংগঠনটির আমীর শাহ আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানির হাতে। সংগঠনের মহাসচিব আল্লামা হাফেজ জুনায়েদ বাবুনগরী ও আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানির দ্বন্দ্বে সংগঠনটির ভেতরের কোন্দল প্রকাশ্যে এসেছে। হাটহাজারী মাদ্রাসার সহকারী পরিচালক পদ থেকে জুনায়েদ বাবুনগরীকে অপসারণের পর থেকে দুইপক্ষ আলাদা অবস্থান নিয়েছে। বাবুনগরী ও আনাস মাদানী প্রকাশ্যে একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কথা বলছেন।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মজলিসে সুরার বৈঠকের মাধ্যমে যেভাবে জুনায়েদ বাবুনগরীকে দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর (হাটহাজারী মাদ্রাসা) সহকারী পরিচালক পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, তেমনিভাবে হেফাজতের পদ থেকেও সরিয়ে দেয়া হতে পারে। আসতে পারেন নতুন মহাসচিব। এর মাধ্যমে শাপলা চত্বরে জমায়েতের ঘোষণা দিয়ে সৃষ্টি হওয়া হেফাজতে ইসলাম ভেঙে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা।

ইতোমধ্যে নতুন সম্ভাব্য মহাসচিব হিসেবে ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশের মহাসচিব ও হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ ও হেফাজতের অপর যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা সলিমুল্লাহর নামও শোনা যাচ্ছে। বিষয়টি জানতে মুফতি ফয়জুল্লাহকে ফোন করলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে মাওলানা সলিমুল্লাহ বলেন, এ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। আলোচনা যতক্ষণ হবে না, ততক্ষণ এ নিয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়। হেফাজতের নতুন মহাসচিব হিসেবে নাম আসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুনিয়ার সবকিছুই পরিবর্তনশীল। তবে হেফাজতের মজলিসে সুরার বৈঠকই সব সিদ্ধান্ত নেবে। বৈঠক কবে হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো দাওয়াত পাইনি। হালকা হালকা শুনছি বৈঠক হতে পারে।

জানা যায়, হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফী অসুস্থ হলে তড়িঘড়ি করে হাফেজ জুনায়েদ বাবুনগরীকে মাদ্রাসার সহকারী পরিচালক করা হয়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এই পদে আসীন হয়ে আহমদ শফীর অনুপস্থিতিতে তাঁর মাদ্রাসার শীর্ষপদে বসার পথ সুগম হয়। ফলে হেফাজতে ইসলাম ছাড়াও হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্রুতই বাবুনগরীর প্রভাব বাড়তে থাকে। এরপর গত ১৭ জুন তড়িঘড়ি করে মাদ্রাসার মজলিসে সুরার বৈঠক ডেকে সহকারী পরিচালক পদ থেকে জুনায়েদ বাবুনগরীকে সরিয়ে দেয়া হয়। নতুন সহকারী পরিচালক করা হয় মাদ্রাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস শেখ আহমদকে, যিনি দুইবছর আগে হাটহাজারী মাদ্রাসায় যোগ দিয়েছেন। এর আগে তিনি ফটিকছড়ির নানুপুর মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। মূলত শফীপুত্র আনাস মাদানির চেষ্টায় শেখ আহমদ হাটহাজারী মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে আসেন।

সহকারী পরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর ফুঁসে উঠেন জুনায়েদ বাবুনগরী। তিনি তখন গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, সহকারী পদ থেকে তিনি সরতে চাননি। তাঁর অনিচ্ছাতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি হেফাজত ও মাদ্রাসার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বললে এর প্রতিবাদে কথা বলেন হেফাজতে ইসলামের প্রচার সম্পাদক ও শফী পুত্র আনাস মাদানি। একপর্যায়ে তিনি জুনায়েদ বাবুনগরীকে জামায়াতে ইসলামের এজেন্ট বলেও দাবি করে বলেন, বাবুনগরীর কারণে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা মার খেয়েছেন।

আনাস মাদানীর এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করে জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, আজকে যারা সরকারের পক্ষ নিয়েছেন, তারাই শাপলা চত্বরের সরকারবিরোধী জমায়েত করেছিলেন। বাবুনগরী দাবি করেন, হেফাজতের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফীর জ্ঞাতসারেই সরকারবিরোধী সব কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল।
হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই সংগঠনটির মহাসচিব হাফেজ জুনায়েদ বাবুনগরী আওয়ামী লীগ বিরোধী অবস্থান নেন। প্রকাশ্যে ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন বলে দাবি করলেও বাবুনগরী ছিলেন প্রচ-ভাবে আওয়ামী লীগ বিরোধী। এ ধরনের বক্তব্যের কারণে তিনি সরকারের শ্যেন দৃষ্টিতে ছিলেন। ফলে শাপলা চত্বরের জমায়েত বানচাল করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ধরপাকড় শুরু করলে জুনায়েদ বাবুনগরীও গ্রেপ্তার হন।

সূত্র জানায়, আহমদ শফী দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত কারণে হেফাজত ও মাদ্রাসার কর্মকা- তদারকিতে অক্ষম হয়ে পড়ছেন। একাধিকববার তাকে বিদেশে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। নিজের বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় আহমদ শফী ছোট ছেলে আনাস মাদানির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এ সুযোগে আনাস হাটাহাজারী মাদ্রাসা ও হেফাজতে ইসলামে নিজের বলয় বাড়াতে তৎপরতা চালাচ্ছেন। সম্ভাব্য মজলিসে সুরার বৈঠকের মাধ্যমে জুনায়েদ বাবুনগরীকে বাদ দিয়ে সেখানে আনাস মাদানীর ঘনিষ্ঠ কাউকে হেফাতের মহাসচিব পদে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। এর মাধ্যমে হেফাজত থেকে বাবুনগরীর অনুসারী বেশিরভাগ নেতাই বাদ পড়তে পারেন। বাবুনগরীর অনুসারীরা এখনো ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবিতে অটল আছেন। কিন্তু হেফাজতের আমীরের অনুসারীদের এ নিয়ে আর কথা বলতে শোনা যায় না।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 177 People

সম্পর্কিত পোস্ট