চট্টগ্রাম রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২০

সর্বশেষ:

বন্ধ হচ্ছে চট্টগ্রামের ৯ পাটকল
পাওনা বুঝিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে বন্ধের সিদ্ধান্ত

২৯ জুন, ২০২০ | ১২:৩০ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ আলী

বন্ধ হচ্ছে চট্টগ্রামের ৯ পাটকল

অব্যাহত লোকসানের কারণে সারাদেশের ন্যায় চট্টগ্রামের ৯টি সরকারি পাটকলও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া প্রায় শেষ করে এনেছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয়ের অধীন পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে সারাদেশে ২৫টি চালু কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় স্থায়ী-অস্থায়ী মিলে ২৬ হাজার শ্রমিক কাজ করে। তাদেরকে গোল্ডেন হ্যান্ডশেক প্রদান করা হচ্ছে। শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধসহ অন্যান্য ব্যয় মেটাতে বিজেএমসি’কে পাঁচ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে সরকার।
বন্ধ হতে যাওয়া চট্টগ্রামের ৯টি সরকারি মিল হচ্ছে : আমিন জুট মিল, হাফিজ জুট মিল, গুল আহম্মদ জুট মিল, গালফ্রা হাবিব জুট মিল, বাগদাদ ঢাকা কার্পেট ফ্যাক্টরি, এম এম জুট মিল, আর আর জুট মিল, মিল ফার্নিশিং ও কে এফ ডি। এসব মিলে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক রয়েছে। তাদেরও গোল্ডেন হ্যান্ডশেক দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
বিজেএমসি সূত্র জানায়, বন্ধের পর সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে নতুন ব্যবস্থাপনায় এসব পাটকল আবার চালু করা হবে। নতুন ব্যবস্থাপনায় এসব কারখানায় পুরোনো শ্রমিকদের চাকরির নিশ্চয়তা থাকবে। তাদের কর্মসংস্থানের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েই পরবর্তী কৌশল সাজাচ্ছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো এবং তাদের কাজের সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য নতুন পিপিপি ব্যবস্থাপনায় পাটকল স্থাপন করার শর্ত দেওয়া হচ্ছে। অন্য কোনো কারখানা স্থাপন করা যাবে না।
এ প্রসঙ্গে বিজেএমসির চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ গণমাধ্যমকে বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের ব্যবস্থাপনায় থাকা সারাদেশের সব মিল বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। তবে এতে শ্রমিকদের চিন্তার কোনো কারণ নেই। তারা তাদের সব পাওনা পাবেন। এ নিয়ে কাজ করছে বিজেএমসি।
তবে ভিন্ন কথা জানিয়েছেন বিজেএমসি’র চট্টগ্রামের লিয়াজো কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন। দৈনিক পূর্বকোণকে তিনি বলেন, ‘সরকারি পাট কল বন্ধের কোন সিদ্ধান্ত আমি জানি না, এ ব্যাপারে কোন চিঠি আসেনি। চিঠি আসলে জানতে পারবো’।
আমিন জুট মিল সিবিএ’র সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মোস্তাফা দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘পাটকল বন্ধের ব্যাপারে আমরা শুনেছি। তবে এ নিয়ে আমিন জুট মিলে এখনো পর্যন্ত কোন প্রতিক্রিয়া নেই। আমাদের দাবি হচ্ছে, সরকার পাটকল বন্ধ করে দিলে শ্রমিকদের সকল পাওনা যাতে এক সাথে পরিশোধ করে। এতে তারা কিছু একটা করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে। এছাড়া পুনরায় মিল চালু হলে তা সরকারিভাবে যেন চালু করা হয়।
এদিকে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বলেন, দেশের পাটকলগুলোতে অব্যাহত লোকসানের মুখে ২৪ হাজার ৮৮৬ জন শ্রমিককে গোল্ডেন হ্যান্ডশেক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। গতকাল (রবিবার) এক ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে পাটকলগুলোতে লোকসান হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, আমরা লোকসান নিয়ে পাটকল চালাতে পারি না। সরকার চিন্তা করেছে শ্রমিকদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেক দিয়ে এই খাতকে এগিয়ে নিতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, বিজেএমসি’র ক্রমবর্ধমান লোকসানের কারণে শ্রমিকদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেক প্রক্রিয়ায় অবসায়নের মাধ্যমে মিলগুলোকে বর্তমান দেশিয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিকায়ন করা হবে। পাটকল শ্রমিকদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেক দেওয়ার পর সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে পাটকলগুলোকে আধুনিকায়ন করে উৎপাদনমুখী করা হবে। তখন এসব শ্রমিক সেখানে চাকরি করার সুযোগ পাবেন।
মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ৪০ বছর আমরা কোনো লাভ করতে পারিনি, সব সময় লোকসান হচ্ছে। সে কারণে সরকার চিন্তা করেছে কীভাবে গোল্ডেন হ্যান্ডশেক এর মাধ্যমে কারখানাগুলোকে আধুনিকায়ন করে এগিয়ে নিতে পারি। সেজন্য প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের ক্ষতি না করে তাদের লাভবান করার জন্য এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বস্ত্র ও পাট সচিব লোকমান হোসেন মিয়া বলেন, ২০১৪ সাল থেকে অবসরপ্রাপ্ত ৮ হাজার ৯৫৪ জন শ্রমিকের প্রাপ্য সকল বকেয়া, বর্তমানে কর্মরত ২৪ হাজার ৮৮৬ জন শ্রমিকের প্রাপ্য বকেয়া মজুরি, শ্রমিকদের পিএফ জমা, গ্রাচ্যুইটি এবং সেই সাথে গ্রাচ্যুইটির সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশ হারে অবসায়ন সুবিধা একসাথে শতভাগ পরিশোধ করা হবে। এজন্য সরকারি বাজেট হতে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রদান করা হবে।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে বিজেএমসির আওতায় পাটকল রয়েছে ২৬টি। এরমধ্যে একটি (মনোয়ার জুট মিল) বন্ধ রয়েছে। বেসরকারি খাতের পাটকলগুলো লাভ করলেও নানা অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দুর্নীতিতে বছরের পর বছর লোকসান গুনছে সরকারি পাটকলগুলো।
লোকসানে থাকা পাটকলগুলোর অর্থায়নের বিষয়ে গত বছরের ১৪ মে সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকশেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে গত ১০ বছরে ৭ হাজার কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। পাটকলে আর কতদিন অর্থায়ন করব? গত ১০ বছরে তো আমরা ৭ হাজার কোটি টাকা দিয়েছি। এটা অনেক বড় অংকের টাকা’।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সরকারি পাটকলে বছরে গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকার লোকসান গুনতে হয়। বেতনের দাবিতে প্রায়ই শ্রমিকদের আন্দোলনে নামতে হয়। তাদের দাবির মুখে সরকার কিছু অর্থ বরাদ্দ দিয়ে বকেয়া পরিশোধ করে। যেহেতু লোকসানি প্রতিষ্ঠান সে কারণে আবার কয়েকদিন পর একই সংকট তৈরি হয়। শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসে। সরকারের সমালোচনা হয়। এভাবে বছরের পর বছর লোকসান এবং শ্রম অসন্তোষের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বিজেএমসির পাটকলগুলো। লোকসানের কারণ হিসেবে তারা জানান, বছর বছর ইনক্রিমেন্ট মিলে বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের তুলনায় বিজেএমসির পাটকল শ্রমিকদের বেতন অন্তত তিনগুণ। যন্ত্রপাতি পুরোনো হওয়ার কারণে উৎপাদন ক্ষমতা অর্ধেকেরও কম। বিপণন নেটওয়ার্কে আছে দুর্বলতা। আছে দুর্নীতি ও অনিয়ম। ফলে বাণিজ্যিকভাবে মুনাফার মুখ দেখার কোনো সম্ভাবনা নেই। দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের কথা বিবেচনা করে এক ধরনের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মতো করে পাটকলগুলো চালু রাখা হয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে, শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে এককালীন ব্যয় হলেও বছর বছর বড় লোকসান টানার চেয়ে তা শ্রেয়তর।

পূর্বকোণ / আরআর

The Post Viewed By: 66 People

সম্পর্কিত পোস্ট