চট্টগ্রাম শনিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২০

২৭ জুন, ২০২০ | ৬:২২ অপরাহ্ণ

আল-আমিন সিকদার

ঘরবন্দী থাকতে নারাজ বাসিন্দারা

উত্তর কাট্টলীতে এ কেমন লকডাউন?

গত ১৩ জুন শনিবার কেন্দ্রীয় টেকনিক্যাল কমিটির এক সভায় চট্টগ্রামের শহরের ১০টি ওয়ার্ডকে ‘রেড জোন’ হিসেবে ঘোষণা করে। করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনা করে এসব ওয়ার্ডগুলোকে রেড জোন ঘোষণা করা হয়। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এসব রেড জোনে কঠোর লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেয় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। প্রথমেই নগরীর ১০ নম্বর উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ড ২১ দিনের লকডাউন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বাস্তবায়নও করা হয় ১৬ জুন মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে। লকডাউন কার্যত করতে এলাকাবাসীর উদ্দেশ্যে ৭টি নির্দেশনা দেয় চসিক। যেখানে সাধারণ মানুষকে পূর্ব থেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সংগ্রহ করতে অনুরোধ করা হয়। যাদের সামর্থ্য নেই তাদের বাসায় সরকারি সাহায্য পাঠাতে খোলা কন্ট্রোল রুম। নিয়োজিত করা হয় সেচ্ছাসেবক। এলাকাজুড়ে ঘোষণা করা হয় সাধারণ ছুটি। তবে এসব কিছু ছিল ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ। কারণ, লকডাউন শুরুর প্রথম দিনেই লকডাউন ভেঙে বাহিরে যেতে দেখা গেছে সাধারণ মানুষদের। খোলা ছিল  সেখানকার শিল্পকারখানাগুলোও। যা অভিযান পরিচালনা করে বন্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। কারখানা বন্ধ করতে এসব নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা সক্ষম হলেও বন্ধ করতে পারেননি সাধারণ মানুষের অবাধে চলাচল। লকডাউন কার্যকরের ১০দিন পার হয়ে গেলেও ঘরবন্দী থাকতে নারাজ এখানকার স্থানীয়রা। স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘খালি পেটে ঘরবন্দী থাকা যায় না’। তাইতো উপার্জনের তাগিদে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বাহিরে বের হতে দেখা গেছে নিম্ম আয়ের মানুষদের।

অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিকভাবে লকডাউন পালন করা সম্ভব না হলে সংক্রমণ ঠেকানো কোনভাবে সম্ভব নয়। সংক্রমণ ঠেকাতে না পারলে লকডাউন উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়বে।

সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, কর্নেল জোনস রোড ও ঈশান মহাজন সড়ককে ঘিরেই চলছে প্রশাসনের এ লকডাউন। সিটি গেট এলাকাসহ কর্নেলহাট সিডিএ এলাকায় লকডাউনের কোনো চিহ্নও নেই। ফলে লকডাউনে আটকে থাকা মানুষ এ লকডাউনকে নাটকীয় লকডাউন বলে মন্তব্য করছেন। পাশাপাশি নিম্নআয়ের জনগণ লকডাউন না মেনে তাদের এলাকা থেকে বেরিয়ে অন্য এলাকায় যেতে চাচ্ছেন জীবিকার কারণে। অনেকেই প্রতিদিন যাচ্ছেন কর্মস্থলে। কারণ, লকডাউনের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে বিসিক শিল্পাঞ্চলকে। সেখানে কর্মরত শ্রমিকরা যোগ দিচ্ছেন কাজে।

লকডাউন অমান্যকারীদের মধ্যে একজন জাকারিয়া। তার কাছে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘লকডাউন শুরুর দিকে দেখলাম চারদিকে শুধু পুলিশ আর পুলিশ। হাতে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন স্বেচ্ছাসেবীরাও। ভালো কথা। ভাবলাম ভালো কিছু হতে যাচ্ছে। পূর্বের ঘোষণা অনুযায়ী ভেবেছি ঘরে বসেই পাবো সরকারি খাদ্য সহায়তা। কিন্তু না। সেটা ভাবনাতেই থেকে গেলো। নিম্ম আয়ের মানুষদের ৫ কেজি করে চাল দিলেও সাহায্য থেকে বঞ্চিত ছিলাম আমরা মধ্যবিত্তরা। ৩-৪ দিন কষ্ট করে চললেও কাজে যোগ না দিলে এখন একদমই খেতে পারবো না। খাদ্য সেবা নিশ্চিত না করে এটা কোন ধরণের লকডাউন?। লোক দেখানো লকডাউন না দিয়ে মানুষকে বাঁচান’।

এদিকে লকডাউনকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো বরাদ্দ আসেনি বলে গণমাধ্যমকে জানান চট্টগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সজীব চক্রবর্তী। তবে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ কর্মসূচির শুরুর দিকে সিটি কর্পোরেশনকে ২ হাজার মেট্রিক টন চাল ও ৬২ লাখ ২০ হাজার নগদ অর্থ প্রদান করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে সঠিকভাবে লকডাউন বাস্তবায়ন করতে সাধারণ মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা। এজন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলেও নিশ্চিত করেন তিনি। তবে এরইমধ্যে লকডাউন এলাকায় সরকারের পূর্বের ত্রাণ থেকে ৫ কেজি ওজনের চার হাজার বস্তা চাল বিতরণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সাধারণ মানুষের খাদ্য চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন স্থানীয় কাউন্সিলর নিছার উদ্দীন আহমেদ মঞ্জু। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, ‘এই ওয়ার্ডে প্রায় এক লাখ মানুষের বসবাস। যার মধ্যে নিম্ম আয়ের মানুষ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার এবং নিম্ম মধ্যবিত্ত সাড়ে ৩ হাজার। এই আট হাজার মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করা খুবই প্রয়োজন। কিন্তু লকডাউন নিয়ে কোন বরাদ্দ না থাকায় আমরা এ চাহিদা পূরণ করতে পারছি না। যদিও সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে পাওয়া ৪ হাজার ত্রাণ আমরা সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছি। যদিও তা ২১ দিন লকডাউনের জন্য পর্যাপ্ত না’।

এছাড়াও লকডাউন বাস্তবায়নে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেছেন এ কাউন্সিলর। তিনি বলেন,‘লকডাউন শতভাগ সফল করতে প্রথমত পুলিশ সদস্য বাড়াতে হবে। প্রশাসনিক টহল জোরদার করতে হবে। লকডাউন এলাকার জন্য আর্থিক বরাদ্দ দিতে হবে এবং লকডাউন এলাকার মানুষদের সাধারণ ছুটি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় লকডাউন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।’

এদিকে এই স্বল্প লকডাউনের মধ্যেও সুফল মিলছে বলে জানিয়েছেন তিনি। কাউন্সিলর বলেন, ‘লকডাউনের পূর্বে এই ওয়ার্ডে করোনা পজেটিভ রোগীর সংখ্য ছিল ১৪৫ জন। আর লকডাউনের ১০দিনে নতুন করে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন মাত্র ৯ জন। যদিও তারা অনেক আগেই নমুনা জমা দিয়েছিলেন। তবুও তা স্বস্তির খবর। আশা করছি শতভাগ লকডাউন নিশ্চিত হলে করোনা নির্মূল করা না গেলেও এর সংক্রমণ শতভাগ ঠেকানো যাবে’।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 236 People

সম্পর্কিত পোস্ট