চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

২৬ জুন, ২০২০ | ৭:১৩ অপরাহ্ণ

মোস্তফা মোহাম্মদ এমরান 

ভার্চুয়াল কোর্ট নিয়ে আইনজীবীদের অসন্তোষ

ভার্চুয়াল কোর্টে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না বেশিরভাগ আইনজীবী। বয়োজ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের প্রায় শতকরা ৯৫ ভাগ আইনজীবী অতীতে পেশাগত ব্যস্ততার কারণে প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকায় ভার্চুয়াল কোর্টের সুবিধা নিতে পারছেন না বলে মনে করেন সাধারণ আইনজীবীরা।
অপরদিকে, ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম চালু হওয়ার পর নানা অসুবিধা নিয়ে বেশিরভাগ আইনজীবী অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, ভার্চুয়াল আদালতে কেবল জামিন শুনানিটাই অনলাইনে হচ্ছে। জামিননামা দাখিল ও জামিন শুনানির প্রস্তুতি নিতে নথি দেখার জন্য যেতে হয় আদালতের সেরেস্তা ও জিআরও সেকশনে। তাই করোনারোধে ভার্চুয়াল কোর্ট চালু হলেও শুনানিতে অংশগ্রহণকারী আইনজীবী ও কোর্টের স্টাফদের করোনায় সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েই যাচ্ছে।
এদিকে, সম্মিলিত সাধারণ আইনজীবীদের ব্যানারে ১ জুলাই থেকে নিয়মিত আদালত চালুর দাবিতে আইনজীবী সমিতির বরাবরে স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে। নিয়মিত কার্যক্রম চালু না হলে তারা ভার্চুয়াল আদালতে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকবেন বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। আইনজীবীদের দাবি সম্বলিত স্মারকলিপি জেলা আইনজীবী সমিতি ইমেইল ও ডাকযোগে প্রধান বিচারপতি ও আইনমন্ত্রী বরাবর প্রেরণ করেছেন।
অপরদিকে, ভার্চুয়াল আদালতে শুধুমাত্র হাজতি আসামির জামিন শুনানি ও চেক ডিজঅনার মামলা দায়ের ছাড়া অন্য কোন কার্যক্রম না থাকায় নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর আদালতের উপর ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার অতিরিক্ত চাপ পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে, ভার্চুয়াল কোর্টে নিয়মিত মামলা, ট্রায়াল না হওয়ায় বিচারপ্রার্থীরা আইনের আশ্রয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলেও জানান একাধিক আইনজীবী।
“আদালত কর্তৃক তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার সম্পর্কিত অধ্যাদেশ-২০২০” জারি হওয়ার পর ১১ মে থেকে চট্টগ্রাম আদালতে ভার্চুয়াল কোর্ট চালু হয়। সিএমএম আদালত ও চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ভার্চুয়াল কোর্টে এ যাবত চট্টগ্রামের অন্যান্য আদালতের চেয়ে বেশি জামিনের দরখাস্ত দাখিল ও শুনানি হয়েছে। সিএমএম আদালতে গতকাল পর্যন্ত ১৯৭৪টি ও সিজেএম আদালতে ১৭০৮টি জামিনের দরখাস্ত দাখিল হয়েছে বলে আদালত সূত্রে জানা যায়। দায়রা আদালত ও ট্রাইব্যুনালগুলোতে দরখাস্ত দাখিল হওয়ার পরিমাণ খুবই নগন্য। নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালগুলোতে পুরো সপ্তাহ মিলে ৫ টির কম দরখাস্ত দাখিল হয় বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল পিপি।
এদিকে, বিভিন্ন স্তরের আইনজীবীদের মধ্যে ভার্চুয়াল আদালতের পরিবর্তে ১ জুলাই থেকে নিয়মিত আদালত চালুর দাবি ওঠেছে। সম্প্রতি সম্মিলিত সাধারণ আইনজীবী ব্যানারে এক সভা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুস সাত্তারের সভাপতিত্বে সমিতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। এতে তিন শতাধিক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। সভাশেষে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের স্মারকলিপি আইনজীবী সমিতির কাছে হস্তান্তর করা হয়। জানতে চাইলে জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এএইচএম জিয়াউদ্দিন জিয়া পূর্বকোণকে বলেন, আইনজীবীদের দাবি আমরা প্রধান বিচারপতি ও আইনমন্ত্রীর বরাবর প্রেরণ করেছি।
এ প্রসঙ্গে এডভোকেট আবদুস সাত্তার পূর্বকোণকে বলেন, ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনা করার মত আদালতে দক্ষ কর্মচারী নেই। এছাড়া কর্মচারীদের তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও হয়নি। অপরদিকে, ভার্চুয়াল কোর্টে শুনানি ছাড়া বেইলবন্ড দাখিল ও মামলার নথি দেখার জন্য সেরেস্তায় যেতে হয়। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিয়মিত আদালত চালু করা খুবই প্রয়োজন। অন্যান্য অফিস, হাটবাজার, উপসনালয় সবই চালু হয়েছে। কেবল আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ রেখে ভার্চুয়াল কোর্টে সীমিত কার্যক্রমকে তিনি এক ধরণের ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেন।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইনবুল ২ এর পিপি এমএ নাসের পূর্বকোণকে বলেন, ভার্চুয়াল কোর্টের জামিন শুনানিতে মূল নথি না থাকায় রাষ্ট্রপক্ষে প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত আদালতে উপস্থান করা সম্ভব হয় না। সিডি বা মামলার নথিও শুনানির আগে পিপিদের কাছে উপস্থাপন করার সুযোগ না থাকায় শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা প্রয়োজনীয় বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেন না। এজন্য বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে, দাবি প্রসঙ্গে জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এএইচএম জিয়াউদ্দিন পূর্বকোণকে বলেন, সাধারণ আইনজীবীদের দাবির পক্ষে সমিতি একমত। তিনি বলেন, বেশিরভাগ আইনজীবী ভার্চুয়াল কোর্টে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না। তাই আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিয়মিত কোর্ট চালুর পক্ষে। তবে, করোনা পরিস্থিতিও মাথায় রেখে এর একটা বিহীত ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি বলেন, বিচারক, আইনজীবী, আদালতের স্টাফ, বিচারপ্রার্থীসহ সকলের স্বাস্থ্য-নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আদালতে কার্যক্রম শুরু করা প্রয়োজন রয়েছে। কারণ নিয়মিত আদালত না থাকায় বিচারপ্রার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়া ফৌজদারি যেসব মামলা থানায় নেয় না বা নেয়ার এখতিয়ার নেই সেসব মামলাও থেমে রয়েছে। ফলে নিয়মিত কোর্ট যত বিলম্বে চালু হবে আদালতের উপর মামলার চাপের বোঝা ততই বাড়বে। তাই স্বাস্থ্যবিধি কিভাবে পালন করা যায় সেব্যাপারে বিচারক, আইনজীবী, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগে সিদ্ধান্ত নিয়ে আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 142 People

সম্পর্কিত পোস্ট