চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০২০

২৬ জুন, ২০২০ | ৬:২২ অপরাহ্ণ

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন 

করোনার কারণে কোরবানির আমেজ এবার নেই

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী হাজি মো. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি ৩৫নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজি নুরুল হকের পুত্র। গত বছর কোরবানিতে সাড়ে ১৩ লাখ টাকা দরে চারটি গরু কিনে কোরবানি দিয়েছেন। এবার একটি কমিয়ে এনে তিনটি গরু কেনার বাজেট করেছেন। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর থেকে দুই দফায় ১৩-১৪ হাজার পরিবারকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। ঈদেও রাজনৈতিক সহকর্মী ও গবিরদের মধ্যে ঈদসামগ্রী দেওয়া হয়েছে। সবমিলে প্রায় কোটি টাকার অনুদান দেওয়া হয়েছে।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দেশের পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে ঈদের মতো কোরবানিতে আগের সেই আমেজ আর থাকবে না। তাই আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-পড়শিদের মধ্যে মাংস বিলি-বন্টন কমিয়ে আনা হবে। কোরবানি দেওয়া তিনটি গরু এবার গরিব-মিসকিনদের মধ্যে বিলি-বন্টন করে দেওয়া হবে। জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুহাম্মদ ইউনুস প্রতিবছর ঈদে গ্রামের বাড়ি বোয়ালখালীর খরণদ্বীপে ঈদ উদযাপন করেন। করোনা পরিস্থিতির কারণে ঈদুল ফিতরে গ্রামে আসেননি। অনেকটা শহরে বাসাবন্দী ঈদ কাটিয়েছেন পরিবার নিয়ে। কোরবানির ঈদেও বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত এখনো নেননি তিনি। মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, বৈশি^ক পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে এখনো কোরবানি ঈদ নিয়ে কোনো চিন্তা-ভাবনা করা হয়নি। করোনা পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার মনস্থির করবেন। তিনি বলেন কোরবানির সেই আমেজ এবার নেই। গত মার্চ থেকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর দেশের পরিবেশ-পরিস্থিতি অনেকটা বদলে যায়। মানুষের মধ্যে ভয়-ভীতি ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। দিন দিন প্রাদুর্ভারের হার বেড়ে চলেছে। তিন মাসের লকডাউনে দেশে অর্থনীতির অবস্থাও ভালো নেই। ব্যবসা-বাণিজ্য, দোকানপাট বন্ধ ও বেসরকারি চাকরিজীবীসহ শত শত লোক কর্মহীন। কষ্টে দিনযাপন করছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। গত এক বছর ধরে কোরবানির প্রস্তুতি নিচ্ছেন ছোট-বড় খামারি থেকে শুরু করে ব্যক্তি উদ্যোক্তরা। লালন-পালন করেছেন শত শত কোরবানির পশু। গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া ও কোরবানিযোগ্য অন্যান্য প্রাণী। প্রতিবছর কোরবানিতে বড় অবদান রেখে আসছে নাহার এগ্রো। নাহার গ্রুপের পরিচালক তানজিব জাওয়াদ রহমান পূর্বকোণকে বলেন, ‘কোরবানির গরু হাট-বাজারে নেই। খুলশীতে সেলস বা প্রদর্শন সেন্টার রয়েছে। সেলস সেন্টার বা খামার থেকে বিক্রি করা হবে’। তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে একজন ক্রেতার জন্য আধা ঘণ্টা সময় বেধে দেওয়া হবে। অনলাইনে আগ থেকে সময় নিতে হবে। সেই মতে ক্রেতাদের ডিসপ্লে সেন্টার বা খামারে সময় দেওয়া হবে’।
এবার কোরবানিতে বিক্রিযোগ্য সাড়ে তিনশ’ গরু লালন-পালন করেছে নাহার এগ্রো। অনলাইন বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সেগুলো বিক্রি করা হবে। ক্রেতাদের জন্য সুরক্ষাসামগ্রীর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে বলে জানান নাহার গ্রুপের পরিচালক তানজিব জাওয়াদ রহমান।
করোনা পরিস্থিতির কারণে এবার ঈদুল ফিতর অনাড়ম্বরে উদযাপিত হয়েছে। সরকার স্বাস্থ্যসুরক্ষা মেনে মার্কেট-বিপণি বিতান খোলার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু করোনাভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কায় পরবর্তীতে বিভিন্ন মার্কেট কমিটি দোকানপাট না খোলার সিদ্ধান্ত নেয়। ঈদের নামাজ আদায় করে ঘরে থেকেই ঈদ উদযাপন করে মুসলমানরা।
ঈদুল আজহা বা কোরবানি ঈদ হচ্ছে মুসলমানদের অন্যতম বড় উৎসব। লাখ লাখ গরু, ছাগল, মহিষ জবেহ করা হয়। কিন্তু এবারের চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। ঈদুল ফিতরের মতো ঈদুল আজহায়ও মানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা অনেকটা কম।
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্র জানায়, গত বছর ৭ লাখ ২০ হাজার ৭৮৯টি পশু জবেহ করা হয়েছে কোরবানিতে। এবারও সমসংখ্যক পশু জবেহ করা হবে বলে জানান জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রেয়াজুল হক জসিম। তিনি বলেন, ৬ লাখের বেশি পশু স্থানীয়ভাবে লালন-পালন করা হয়েছে। আর কোরবানিতে দেড় থেকে দুই লাখ পশু আশপাশ এলাকা বা অন্যান্য জেলা থেকে আনা হয়। সবমিলে কোরবানিতে পশুর সংকট হবে না।
কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জ্যার টেক এলাকার খামারি মো. আকতার হোসেন জেকি বলেন, ‘এবার কোরবানিতে হাট-বাজারে যাওয়ার চিন্তা-ভাবনা করবে না ক্রেতা। পাড়া গাঁ বা খামার থেকে কেনার আগ্রহ বেশি থাকবে। খামারে স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় থাকবে’। এবার অনলাইনে সাড়া পাচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যেই অনলাইনে অনেকে সাড়া দিয়েছেন। খামারে স্বাস্থ্যসুরক্ষা মেনেই কোরবানির পশু বিক্রি করা হবে। হাট বা বাজারে নেওয়া হবে না।
নগরীর বক্সিরহাট ওয়ার্ড এলাকার ব্যবসায়ী পুত্র ফখরুল আবেদীন জিহান বলেন, প্রতিবছর দাদা-নানা, বাবা-চাচাদের সঙ্গে হাট-বাজার থেকে কোরবানির পশু ক্রয় করেন। করোনা সংক্রমণের কারণে এবার হাট-বাজারে যাবেন না। তাই বন্ধুর এক খামার থেকে কেনার জন্য তিনটি গরু পছন্দ করে রেখেছেন।
নগরীর রিয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ী আহমদ নবী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। লোকসান গুনতে গুনতে এখন কাহিল অবস্থা। তারপরও কোরবানি তো দিতে হবে। অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার বাজেট কমিয়ে আনা হবে। আগে এক লাখ বা দেড় লাখ টাকায় গরু কেনা হতো। এখন তা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে। আর কোনো উপায় নেই।
কোরবানি ঈদের জন্য ব্যক্তি পর্যায়ে গরু লালন-পালন করেন বিভিন্ন উপজেলায়। বিশেষ করে সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া, রাঙ্গুনীয়া, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী এলাকায় ব্যক্তি পর্যায়ে গরু লালন-পালন করা হয়। বাঁশখালী এলাকার আহমদ হোসেন ও সাতকানিয়ার মো. কামরুল বলেন, তারা ৪-৫টি করে গরু লালন-পালন করেছেন। তারা বলেন, এবারের পরিস্থিতির কারণে হাট-বাজার নিরাপদ মনে করছে না ক্রেতারা। মনে হচ্ছে পাড়াগাঁয়ে ভালো গরু বেচাকেনা হবে। তারপরও পরিস্থিতি অনুধাবন করে কোরবানি ঘনিয়ে আসলে চিন্তা-ভাবনা করবেন।
গরু ব্যবসায়ী মফিউ উদ্দিন বলেন, গরু-মহিষের বাজার এমনিতেই চড়া। তবে কোরবানিতে দর-দাম কাছাকাছি থাকবে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে ছাড় দেওয়ার মন থাকবে। দ্রুত কেনা-বেচা হবে। হাট-বাজারে কেউ বসে থাকবে না। নায্যতা ও শৃঙ্খলা বজায় থাকবে।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 328 People

সম্পর্কিত পোস্ট