চট্টগ্রাম শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

করোনা নমুনা পরীক্ষা: আন্তরিকতা-কিট অভাব দুটোরই

১৮ জুন, ২০২০ | ৭:৪৪ অপরাহ্ণ

ইফতেখারুল ইসলাম

করোনা নমুনা পরীক্ষা: আন্তরিকতা-কিট অভাব দুটোরই

কেস স্টাডি-১ : হালিশহর এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকুরীজীবী নাজমুল হক সুমন, তার মা এবং পরিবারের আরো দুই সদস্য মিলে চারজন গত ৪ জুন নমূনা দেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তখন তাদের পরিবারের দুই সদস্যের মাঝে করোনার উপসর্গ দেখা দিয়েছিল। গতকাল বুধবার ১৩ দিন পার হয়েছে তবুও তাদের রিপোর্ট আসেনি। তবে তারা সবাই এখন সুস্থ।

কেস স্টাডি-২ : করোনা উপসর্গ নিয়ে রাউজানের ষাটোর্ধ এক ব্যবসায়ী গত ৩ জুন মৃত্যুবরণ করেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে লাশ দাফন করেন স্বজনরা। এ নিয়ে এলাকার আশপাশের লোকজনের মাঝে কানাঘুষাও হয়। তাই নিজেদের অবস্থা যাচাই করতে গত ৬ জুন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের বুথে নমূনা দেন মরহুম ব্যবসায়ীরা ছেলেরা। সেই রিপোর্ট গতকাল বুধবার পর্যন্ত আসেনি। তবে তাদের পরিবারের কারো মাঝে এখন কোনো লক্ষণ নেই। সবাই সুস্থ আছেন।

চট্টগ্রামে করোনা ভাইরাসের নমূনা পরীক্ষায় আন্তরিকতা এবং কিট দুটোরই অভাব আছে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। একাধিক ভুক্তভোগীর সাথে আলাপকালে তারা জানান, করোনা নমূনা দেয়া যেমন রোগীদের কাছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। রিপোর্ট পাওয়া আরো বড় চ্যালেঞ্জ। এ যেন এক সোনার হরিণ। দুই সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। ততদিন রোগী হয় পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাচ্ছে নতুবা মৃত্যুবরণ করছে। এই রিপোর্ট হাতে আসার পর কোনো কাজে আসছে না। যাদের পজিটিভ আসছে তারা সুস্থ হয়েও নতুন করে আতঙ্কের মধ্যে পড়ছেন।

পরীক্ষার রিপোর্টের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা শুধুমাত্র যে করোনা রোগীদের ভোগাচ্ছে তা নয়। এর কারণে অন্য সাধারণ রোগীদের ভোগান্তি আরো বেশি হচ্ছে। এখন ডেঙ্গুসহ নানা ধরনের মশাবাহিত রোগ ও জ্বরের মৌসুম চলছে। জ্বরে আক্রান্ত হলেই মানুষ ভয় পাচ্ছে। আতঙ্কিত হচ্ছে। করোনা ভেবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কিংবা নিজে নিজেই অনেকে এন্টিবায়োটিক খাওয়া শুরু করে দিচ্ছেন। অকারণে এন্টিবায়োটিক খাওয়ার ক্ষতিকর দিকের বিষয়টি কেউ মাথায়ও আনছেন না। এছাড়া বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে কোনো জটিল রোগীর জরুরি সার্জারি প্রয়োজন হলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট দেখতে চায়। অপরদিকে করোনা পজিটিভ হলে হয়তো সপ্তাহ দুয়েক পরে রিপোর্ট পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও নেগেটিভ হলে তদবির না করলে তাও পাওয়ার সুযোগ থাকে না। এযেন এক হ-য-ব-র-ল অবস্থা।

এ বিষয়ে জানাতে চাইলে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আ ম ম মিনহাজুর রহমান পূর্বকোণকে বলেন, চট্টগ্রামে করোনার নমূনা পরীক্ষায় ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা আছে। কক্সবাজারে দুইটি মেশিন দিয়ে যদি দিনে ৫০০ রিপোর্ট দিতে পারে তাহলে চমেক হাসপাতালে নয় কেন ? এছাড়া চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি এন্ড এনিমেল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিআইটিআইডিতে মেশিন আছে। এখন যেহেতু যুদ্ধাবস্থা তাই সংশ্লিষ্টদের উচিত, দুই বা তিন শিফটে কাজ করা। প্রয়োজনে তাদেরকে ওভারটাইম দেয়া হোক। তাহলে নমূনা পরীক্ষার হার বাড়বে। এছাড়া চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের একটি টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট আছে। সেখানেও সিনিয়র ছাত্র আছে। তাদেরকেও কাজে লাগানো যেত। কিন্তু কোন উদ্যোগ নেই। তিনি বলেন, করোনা পরীক্ষায় আন্তরিক নয় স্বাস্থ্য বিভাগ। একটি পিসিআর মেশিন দিয়ে যেখানে তিন ঘণ্টায় প্রায় ৯০টি নমূনার রিপোর্ট পাওয়া যায়, সেখানে দিনে অন্তত তিন শিফটে কাজ করলেও তিনগুন রিপোর্ট পাওয়ার কথা। কিন্তু চট্টগ্রামে সেভাবে কাজ হচ্ছে না। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে কিনা তা জানার নমূনা দিয়ে রিপোর্ট পেতে পেতে হয়তো রোগী ভাল হয়ে যাচ্ছে নয়তো মারা যাচ্ছে। এই রিপোর্ট সাধারণ রোগীদের কাজে আসছে না। চমেক হাসপাতালে স্থায়ী এবং আউটসোর্সিং মিলে ১৫ জন টেকনোলজিস্ট আছেন। শিফট বাড়ানোর উদ্যোগ অনেক আগেই নেয়া উচিত ছিল। এখন বুথ আরো বাড়ছে। নমূনা জট আরো প্রকট হবে।

জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালে করোনার নমূনা পরীক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এহসানুল হক কাজল পূর্বকোণকে বলেন, আন্তরিকতার কোন ঘাটতি নেই। তবে জনবল এবং প্রয়োজনীয় কিট এবং অন্যান্য রিএজেন্ট সরবরাহের কিছুটা সীমাবদ্ধতা আছে। সারাদেশেই এটা একই রকম। চমেক হাসপাতলে যে দুইটি মেশিন আছে তা দিয়ে দিনে সর্বোচ্চ ৩৫০টির মত পরীক্ষা করা সম্ভব। তবে এজন্য প্রয়োজন প্রয়োজনীয় লোকবল ও সরঞ্জাম। বর্তমানে একদিনে ২৭০টি পর্যন্ত নমূনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তিনি জানান, এই হাসপাতালে ১০ জন টেকনোলজিস্ট থাকলেও রোস্টার করে পাঁচজন করোনা ল্যাবে আর পাঁচজন অন্যান্য রোগের নমূনা পরীক্ষা করেন। ওই পাঁচজনের মধ্যে তিনজন ল্যাবে এবং বাইরে দুইজন নমূনা সংগ্রহ করেন। তিনি জানান গত এক মাসে ৮ হাজার পরীক্ষা হয়েছে। অর্থাৎ দিনে গড়ে ২৬০টির বেশি। সকাল থেকে রাত অবধি কাজ চলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরীক্ষার সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হলে মেশিন ও জনবল বাড়াতে হবে। প্রতি তিন ঘণ্টায় একবার নমূনার ফল বের হওয়ার কথা সবাই বলেন, কিন্ত এর জন্য প্রস্তুতি, পরবর্তী সেই ফল জানানো- এসব করতে বাস্তবে অনেক বেশি সময় লাগে। তবে টেকনোলজিস্টদের ওভারটাইম করানোর বিষয়ে কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিচ্ছে। আরো টেকনোলজিস্ট পাওয়া যাবে। গতকালও একজন যোগদান করেছেন। তাই সামনে পরীক্ষার হার আরো বাড়বে বলে জানান তিনি।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 190 People

সম্পর্কিত পোস্ট