চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই, ২০২০

গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য

৬ জুন, ২০২০ | ১২:০৮ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

ভাড়াও নিচ্ছে আড়াই থেকে তিনগুণ

গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য

স্বাস্থ্যবিধির ধার ধারে না চালক-হেলপাররা

এক সিটে একজন যাত্রী পরিবহনের নিয়ম থাকলেও দুইজন যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে, যাত্রী-চালক ও হেলপার নিত্য বাকবিতণ্ডা

কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে ২নং গেটের ভাড়া ছিল ৮ টাকা। ৬০ শতাংশ বাড়তি অজুহাতে এখন ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা। ক্ষেত্রেবিশেষে ২০ টাকাও দাবি করা হচ্ছে। এনিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত বাকবিত-া লেগে রয়েছে। এটি শুরু একটি স্টপেজের ক্ষেত্রে নয়, নগরীতে বাসগুলোতে এখন ভাড়া নিয়ে চলছে নৈরাজ্য। প্রতিটি বাসে তিনগুণের কাছাকাছি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। ভাড়া আদায়ে সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করছে না। এ নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত বাকবিত-া লেগে রয়েছে। লকডাউন তুলে নেয়ার পর স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত যাত্রী নিয়ে গণপরিবহন চলাচলের ঘোষণা দেয় সরকার। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য ৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেয় সরকার। কিন্তু সরকারের সেই সিদ্ধান্তকে পুঁজি করে পরিবহন শ্রমিকেরা যাচ্ছেতাই ভাড়া আদায় করছে। আর মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধিও। এক সিটে একজন করে যাত্রী পরিবহনের নিয়ম থাকলেও এক সিটে দুইজন করে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। তার ওপর নেয়া হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া।
তবে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার তাগিদ দিয়েছেন পরিববহন মালিক ও শ্রমিক নেতারা।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পরিবহন বাস মালিক গ্রুপের মহাসচিব বেলায়েত হোসেন বেলাল পূর্বকোণকে বলেন, ‘মহানগরীর অধিকাংশ চালক ও হেলপার শতাংশ বুঝে না। আগের নিয়ম থেকে ভাড়া বাড়িয়ে নিয়েছেন। প্রথম কয়েক দিন বাড়তি ভাড়া নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন সরকারের প্রজ্ঞাপন ও বিআরটিএ-এর ভাড়ার তালিকা ইতিমধ্যেই মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে দিয়ে দিয়েছি। আশা করছি, তালিকা অনুযায়ী ভাড়া আদায় করা হবে।’
যাত্রীদের প্রতি অনুরোধ করে মালিক সমিতির এ নেতা বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে এক সিটে যাতে দুইজন যাত্রী না বসেন, সেই বিষয়ে যাত্রীদের সচেতন হতে হবে। সিট না থাকলে গাড়িতে না ওঠার অনুরোধ করেন তিনি।’
কম যাত্রী পরিবহনের শর্তে ৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ১ জুন থেকে গণপরিবহনে ৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়ে সীমিত পরিসরে গণপরিবহন চালু করা হয়েছে। তবে নজরদারি না থাকায় চালক ও হেলপাররা যাচ্ছেতাই ভাড়া আদায় করছে। মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধিও। এক সিটে একজন করে যাত্রী বসানোর কথা থাকলেও এক সিটে দুইজন করে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে দাঁড়িয়েও যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। আইন না মানার প্রবণতার কারণে চলছে ভাড়া নৈরাজ্য।
স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন চলাচলের বিষয়ে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেন চট্টগ্রাম পুলিশ কমিশনার। বৈঠকে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে কঠোর শর্তারোপ মেনে চলার তাগিদ দেওয়া হয়।
এবিষয়ে বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন ফেডারেশনের চট্টগ্রামের কার্যকরি সভাপতি মো. মুছা বলেন, ‘পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে জীবাণুনাশক, হ্যান্ড স্যানিটেজার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য কঠোরভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কারণ মানুষের জীবন নিয়ে চিনিমিনি খেলার সুযোগ নেই। স্বাস্থ্যবিধি মানা না হলেও আইনগত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে তাদের কোনো আপত্তি থাকবে না বলেও জানান তিনি।
বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়ে মো. মুছা বলেন, পরিবহন শ্রমিকেরা ৬৬ দিন কর্মহীন ছিল। সরকার তা চিন্তা করে ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে। এর চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে প্রশাসন যে ব্যবস্থা নেবে-তা মেনে নেবে শ্রমিক সংগঠন। তবে দূরপাল্লার বাসে সরকারি নিয়ম অনেকটা মেনে চলার চেষ্টা করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নগরীর বিভিন্ন গণপরিবহনেও তা মেনে চলার চেষ্টা করতে হবে। কারণ সরকারি নিয়ম হচ্ছে যাত্রী পরিবহন করবে ৫০ শতাংশ, ভাড়া বাড়তি নেবে ৬০ শতাংশ। একসিটে যাতে দুইজন যাত্রী পরিবহন করা না হয়, সবাইকে সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।
ভাড়া নৈরাজ্যেরোধ ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে বিআরটিএ, জেলা প্রশাসন ও ট্রাফিক বিভাগের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দাবি যাত্রীদের।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদুল ইসলাম পূর্বকোণকে বলেন, ‘গণপরিবহনে সরকারি নিয়ম মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে যাত্রী পরিবহন করতে হবে। যেখানে অনিয়ম ও ভাড়া বাড়তি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে ম্যাজিস্ট্রেটরা অভিযান পরিচালনা করে ব্যবস্থা নিচ্ছেন।’
কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে আগ্রাবাদ এলাকার যাত্রী মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘গণপরিবহন ভাড়া জনগণের জন্য বাড়তি বোঝা হলেও স্বাস্থ্যবিধির মেনে চলার জন্য মেনে নিয়েছে যাত্রী। কম যাত্রীর অজুহাতে আদায় করছে তিনগুণের কাছাকাছি ভাড়া। এতে নি¤œ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং চাকরিজীবীদের জন্য রীতিমতো নাভিশ^াস ওঠেছে। আরেক যাত্রী বলেন, সকাল ও বিকেলে অফিস সময়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ধার ধারে না চালক ও হেলপাররা। এক সিটে দুইজন যাত্রী ছাড়াও দাঁড় করিয়েও যাত্রী পরিবহন করে। ভাড়াও নিচ্ছে আড়াই থেকে তিনগুন। এটা রীতিমতো নৈরাজ্য। যাত্রীরা এর প্রতিবাদ করলে হেনস্থার শিকার হতে হয়। এ নিয়ে প্রতিনিয়ত যাত্রী ও চালক-হেলপারদের সঙ্গে বাকবিত-া যেন লেগে রয়েছে।
পোশাকশিল্পের কর্মী রবিউল হোসেন বলেন, সীমিত বেতনে চাকরি করি। এই সামান্য বেতনে পরিবার, ঘর ভাড়াসহ সবকিছু চালাতে হয়। গণপরিবহন দ্বিগুণের বেশি ভাড়া আদায় করছে। বাড়তি ভাড়া আমাদের জন্য চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিআরটিএ’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুরের জামান সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রজ্ঞাপনের বাইরে বাড়তি ভাড়া আদায় সরকারি নির্দেশনার লঙ্ঘন ও অপরাধ। প্রজ্ঞাপনে নির্দেশিত ভাড়া হারের চেয়ে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার সুযোগ নেই। আমরা সড়কে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’

The Post Viewed By: 120 People

সম্পর্কিত পোস্ট