চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৮ মে, ২০২০

সর্বশেষ:

৮৭% আক্রান্ত ১৪ দিনে

১৫ মে, ২০২০ | ১১:২৩ পূর্বাহ্ণ

ইমাম হোসাইন রাজু

২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত ৬০ জন

৮৭% আক্রান্ত ১৪ দিনে

রয়েছেন সাংবাদিক, পুলিশ ও চিকিৎসকও

সংক্রমণের বিপজ্জনক স্থান হয়ে ওঠছে চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামে করোনা পরীক্ষা শুরু হয় গত ২৫ মার্চ। নমুনা পরীক্ষা শুরুর একমাস তথা গেল ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রামে করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় মাত্র ৭০ জন। কিন্তু গেল ১৪ দিনের ব্যবধানে গত একমাসের তুলনায় চট্টগ্রামে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে ৮৭ শতাংশের বেশি। শুধুমাত্র গত দুই সপ্তাহেই চট্টগ্রামে আশংকাজনকহারে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের করোনাভাইরাসের সংক্রমণের বিপজ্জনক এলাকা হিসেবে দেখছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।
ইতোমধ্যে ঢাকা-নারায়নগঞ্জের পর করোনায় আক্রান্তের সংখ্যায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন চট্টগ্রাম। সংশ্লিষ্টদের ধারণা মানুষের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের আর সামাজিক সংক্রমণের কারণেই এ সংকট তৈরি হয়েছে। যা দিনি দিন আরও বাড়িয়ে তোলবে। এতে পরিস্থিতি অনেকটাই অবনতির ইঙ্গিত। আর এমনটি চলতে থাকলে বড় বিপর্যয় ঘটবে বলেও আশংকা তাদের। তথ্য বলছে, গত ৩০ এপ্রিল চট্টগ্রামে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী সংখ্যা ছিল মাত্র ৭০ জন। একসপ্তাহ পর তথা ৭ মে রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫৯ জনে। কিন্তু দুইদিন পর তা এক লাফে ২১৯ জনে গিয়ে দাঁড়ায়। এর একদিন পর ১০ মে রোগীর সংখ্যা ২৮৬ জনে। কিন্তু গেল বুধবার একদিনেই সর্বোচ্চ রোগী শনাক্ত হওয়ার পর করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৫১৩ জনে। আর গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে নতুন করে আরও ৬০জন শনাক্ত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত আক্রান্ত রোগী সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭৩ জনে।
চট্টগ্রামে দিনদিন রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকটাই উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বাস্থ্য দপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির গতকাল বৃহস্পতিবার পূর্বকোণকে বলেন, ‘মানুষের আচরণ আর অনিয়ন্ত্রিত চলাফেরায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। যা সামনে আরও বৃদ্ধি পেতে থাকবে। মূলত এখন থেকে যদি প্রতিটি জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে আন্ত:জেলাগুলোতেও যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ না করা হয়, তাহলে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হবে চট্টগ্রামকে। তখন নারায়নগঞ্জকেও ছাড়িয়ে যাবে এ চট্টগ্রাম। তাই এ বিষয়ে এখনো সময় থাকতে কার্যক্রর ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ এ চিকিৎসকের।’
গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামের তিন ল্যাবে নমুনা পরীক্ষায় চট্টগ্রামে নতুন করে শনাক্ত হওয়া ৬০ জনের মধ্যে নগরীর শিল্প পুলিশের তিন পুলিশ সদস্য ও তিন চিকিৎসক রয়েছেন। এছাড়া বরাবরের মতো শিশুও রয়েছেন নতুন শনাক্তদের তালিকায়। বাদ যায়নি সংবাদকর্মীও। এ সাংবাদিকসহ চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত দুইজন সংবাদকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।
তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বমোট চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটের বিআইটিআইডি ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও সিভাসুর ল্যাবে সর্বমোট ৩৯৪ টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। যাতে সর্বমোট ৭৬ জনের ফলাফল পজেটিভ আসে। এরমধ্যে চট্টগ্রামের ৬১ জন রয়েছেন। তবে এতে নগরীর বাকলিয়া এলাকার ৭২ বছরের এক বৃদ্ধের দ্বিতীয়বার নমুনা পরীক্ষায় ফলাফল পজেটিভ আসে। বাকি ৬০ জনেই নতুনভাবে শনাক্ত হয়েছেন। যাদের মধ্যে একজনের আগেই মৃত্যু হয়। এছাড়া তিন ল্যাবে পজেটিভ আসাদের মধ্যে রাঙ্গামাটিতে ১১ জন, খাগড়াছড়ির ১ জন, ফেনী জেলার ১জন, নোয়াখালীর ১ জন এবং লক্ষ্মীপুর জেলার ১ জন রয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাতে এ তথ্য নিশ্চিত করেন চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, বুধবার রোগীর সংখ্যা সর্বোচ্চ হলেও, বৃহস্পতিবার কিছুটা কমেছে। তবে দিনদিন তা কমবে কিনা তা সাধারণ মানুষের ওপর নির্ভর করবে। চারদিকে যে অবস্থা, তাতে হয়তো আরও বাড়তে পারে। তাছাড়া এখন বেশি পরিমাণে নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে, সামনে তা আরও বৃদ্ধি পাবে। যত বেশি নমুনা পরীক্ষা হবে, তত বেশি রোগীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে বলেও জানান তিনি।’
তথ্য অনুসারে, বৃহস্পতিবার ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল এন্ড ইনফেকশাস ডিজিজেজ (বিআইটিআইডি) হাসপাতালের ল্যাবে ২৫৭ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। তার মধ্যে ৩৩ জনের ফলাফল পজেটিভ আসে। এরমধ্যে চট্টগ্রামের ২৯ জন রয়েছে। এছাড়া শনাক্ত হওয়াদের মধ্যে ফেনী জেলার ১ জন, রাঙ্গামাটি জেলার ১ জন এবং লক্ষ্মীপুরের ১ জন এবং নোয়াখালীর ১ জন রয়েছেন।
একই দিনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) ল্যাবে সর্বমোট ৬৬ টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। তারমধ্যে সর্বমোট ২৬ জনের ফলাফল পজেটিভ আসে। এদেরমধ্যে নগরীর ২৪ জন এবং উপজেলার ২ জন রয়েছেন। যাদের মধ্যে একজনের নমুনা দ্বিতীয়বার পজেটিভ আসে। এছাড়া চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি এন্ড এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ^বিদ্যালয়ে (সিভাসু) ল্যাবে ৭১টি নমুনা পরীক্ষায় ১৭ জনের ফলাফল পজেটিভ আসে। তাদের মধ্যে চট্টগ্রামের পটিয়ার ৬ জন, খাগড়াছড়ির ১ জন এবং রাঙ্গামাটির ১০ জন রয়েছেন।
চট্টগ্রামে শনাক্ত যারা :
বিআইটিআইডিতে শনাক্তদের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪০ বছর বয়সী সহকারী রেজিস্ট্রার, কর্ণফুলীর শিকলবাহা’র ৩৫ বছরের পুরুষ, শিল্প পুলিশের ৩৫, ১৯ ও ১৯ বছরের তিন সদস্য, পতেঙ্গার খাজুরতলার ৪২ বছরের পুরুষ, বায়েজিদের বার্মা কলোনীর ২১ বছরের যুবক, বন্দরের ফ্রিপোর্ট এলাকার ৩২ বছরের পুরুষ, অক্সিজেন এলাকার ৬৫ বছরের বৃদ্ধ, অক্সিজেন কালাপোল এলাকার ৩৪ বছরের পুরুষ, কোতোয়ালীর পাথরঘাটার ৫০ বছরের বৃদ্ধা, কাটগড়েরর ৩৫ বছরের পুরুষ, নতুন চান্দগাঁও থানার ৬৫ বছরের বৃদ্ধ, ফিরিঙ্গি বাজারের ৫৩ বছরের বৃদ্ধ, ফৌজদারহাটের ৩০ বছরের নারী, ফিরিঙ্গি বাজারের ৩০ বছরের যুবক, ৪২ বছরের পুরুষ, বাঁশখালীর ২৩ বছরের পুরুষ, রাঙ্গুনিয়ার ৪০ বছরের পুরুষ, বাঁশখালীর ৩০ বছরের নারী, নগরীর অলংকার এলাকার ৪২ বছরের পুরুষ, বন্দরের ১৪ বছরের তরুণ, ফৌজদারহাটের ফিল্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৯ বছরের যুবক, নগরীর দুই নম্বর গেট মেয়র গলির চশমা হিলের ৫৫ বছরের বৃদ্ধ, ফিরোজশাহ কলোনীর ৩৮ বছরের পুরুষ, কোতোয়ালীর আলকর এলাকার ১২ বছরের শিশু, একই পরিবারের ৪৩ ও ৮৫ বছরের দুই নারী এবং ১৬ বছরের যুবক রয়েছেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ল্যাবে শনাক্ত হওয়াদের মধ্যে নগরীর নিউমুরিং এলাকার ১৮ বছরের তরুণী, ফিরিঙ্গিবাজারের ৭১ বছরের বৃদ্ধ, রাঙ্গুনিয়ার ৩৮ বছরের পুরুষ, হালিশহরের ৮৫ বছরের বৃদ্ধ, ডবলমুরিংয়ের সিডিএ এলাকার ৫৫ বছরের বৃদ্ধ, লালখান বাজার এমএম আলী রোডের ৫০ বছরের বৃদ্ধা, কর্ণফুলীর ৬০ বছরের বৃদ্ধ (মৃত), চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার এ ব্লকের ৪৫ বছরের পুরুষ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের গাইনী ওয়ার্ডের ৩৬ বছরের চিকিৎসক, পতেঙ্গার ৩৩ বছরের পুরুষ, নন্দনকানন এলাকার ৭৫ বছরের বৃদ্ধ, চকবাজার এলাকার বাসিন্দা ২৭ বছরের চিকিৎসক, অক্সিজেন মোড় জাহান ভিলার ২৭ বছরের যুবক, কোতোয়ালীর সতীষ বাবু লেইনের ৫২ বছরের বৃদ্ধা, একই পরিবারে ১৬ বছরের তরুণী, গোসাইলডাঙ্গা আজিজ মসজিদ এলাকার ২৩ বছরের যুবক, আসাদগঞ্জের ১৭ বছরের যুবক, আগ্রাবাদ এলাকার ৫৩ বছরের বৃদ্ধা, কোরবানীগঞ্জের ৪৩ বছরের পুরুষ, টেরিবাজারের ৬২ বছরের বৃদ্ধ, গোসাইলডাঙ্গার ৫৫ বছরের বৃদ্ধ, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৩৩ বছরের পুরুষ, কোতোয়ালীর খলিফাপট্টির ৩৩ বছরের পুরুষ, পতেঙ্গার ৩৭ বছরের নারী, কোতোয়ালীর ৪৫ বছরের নারী রয়েছেন।
সিভাসুতে শনাক্ত হওয়াদের মধ্যে পটিয়ার ২ নম্বর শোভনদন্ডী ইউনিয়নের রশিদাবাদ এলাকার ২৫ বছর বয়সী নারী ও তার ১ বছরের শিশু সন্তান, পটিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন ৩ বছরের শিশু, একই পরিবারের ৭৫ বছরের বৃদ্ধ, গৌবৃন্দ্রখীল ৮ নম্বর সড়কের ২১ বছরের যুবক ও ৩৬ বছরের পুরুষ রয়েছে।
গত ২৪ ঘন্টায় পরীক্ষা হওয়া ২৫৭ জনসহ বিআইটিআইডি এ নিয়ে ৫ হাজার ৯৭৬ জনের নমুনা এবং সিভাসুর ল্যাবে ১ হাজার ২৭৯ টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এছাড়া চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) ল্যাবে এখন পর্যন্ত ৩৪৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। যার মধ্যে চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত ৫৭৩ জন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে ইতোমধ্যে ৯৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এবং মৃত্যু হয়েছে ২৯ জনের।

The Post Viewed By: 51 People

সম্পর্কিত পোস্ট