চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০

গবেষক থাকলেও নেই গবেষণা

১২ মে, ২০২০ | ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ

ইমাম হোসাইন রাজু

আর্থিক এবং যন্ত্রপাতির সক্ষমতা পেলে করোনা নিয়ে কাজ করতে চান গবেষকরা

গবেষক থাকলেও নেই গবেষণা

জেলায় গবেষণা করার মতো প্রায় ১০ জনের অধিক অভিজ্ঞ গবেষক রয়েছেন

চীনের উহানে কোভিড-১৯ বা নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর তা নিয়ে সারা বিশে^ই শুরু হয় গবেষণা। বিশেষ করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগেও গবেষণা শুরু করেন অনেকেই। এরমধ্যে অনেক গবেষক ভাইরাসটির গতি-প্রকৃতি, লক্ষণ এবং প্রতিরোধ করার উপায় নিয়েও নানা তথ্য প্রকাশ করেছেন। এরমধ্যে ভাইরাসটি একেক দেশে একেক রকম আচরণের কারণে আক্রান্ত ও চিকিৎসা নিয়ে দেখা দিয়েছে ভিন্নতা। তাই এ ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স বা জীবন রহস্য জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন চিকিৎসক ও গবেষকরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে দেড় শতাধিক। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজই হলো গবেষণা। তাই করোনা নিয়ে গবেষণায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আরো বেশি ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। এরমধ্যে চট্টগ্রামেও এ ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করার মতো যথেষ্ট গবেষক রয়েছেন। আর গবেষণার ফলে চিকিৎসা সেবা থেকে শুরু করে ভাইরাসটির সংক্রমণ রোধ করাও সম্ভব বলে মনে করেন তারা। যদিও চট্টগ্রামের গবেষকরা বলছেন, আর্থিক এবং যন্ত্রপাতির সক্ষমতা পেলে তারা এ ভাইরাসের জীবন রহস্য নিয়ে কাজ করতে চান। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসার তাগিদ সংশ্লিষ্টদের।
দেশে এবং বিদেশে জিনতত্ব নিয়ে গবেষণা করা চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আদনান মান্নান পূর্বকোণকে বলেন, ‘গবেষণায় দেখা গেছে, একেক দেশে একেক রকম আচরণ করছে এ ভাইরাস। চীন, আমেরিকায় কিংবা ইতালি- স্পেন। কোন দেশের সাথেই কোভিড আচরণের মিল নেই। চীন থেকে এটি উৎপন্ন হলেও অন্য দেশে গিয়ে তার আচরণ বদলে যাচ্ছে। কোন দেশে মৃত্যু হচ্ছে, কোন দেশে মৃত্যুতো দূরের কথা, আক্রান্তও হচ্ছে না। তাই এ বিষয়ে গবেষণাটা খুবই জরুরি। আর গবেষণা না হলে দেখা যাবে একমাস পরেও অন্ধকারে থাকবে। কিন্তু চট্টগ্রামে এটি গবেষণা করার মতো সামর্থ্য রয়েছে। ডাটা পর্যালোচনা থেকে শুরু করে যথেষ্ট অভিজ্ঞ গবেষক রয়েছেন এখানে। শুধুমাত্র আর্থিক সামর্থ্য পেলে এটি নিয়ে কাজ করা সম্ভব বলেও উল্লেখ করেন তিনি’। তিনি আরও বলেন, ‘আর্থিক বিষয়টিতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে বিষয়টি এমন নয়, বিশে^র অনেক দেশেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসব গবেষণা কাজে এগিয়ে এসেছেন। এক্ষেত্রে চট্টগ্রামেও অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা এ কাজে এগিয়ে আসতে পারে’। শুধু এ ভাইরাসে গবেষণাই নয়, চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু কিংবা সুস্থ হওয়াদের ক্ষেত্রেও কোন গবেষণা হয়নি আজ পর্যন্ত। করোনার চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আক্রান্তদের অনেকেই নিজে নিজে সুস্থ হয়ে পড়ছেন আবার অনেকেই এন্টিবায়োটিক, ম্যালেরিয়ার ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে সুস্থ হয়েছেন। যদিও বিষয়টি পুরোপুরিই অনুমান করেই চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। তবে সুখের খবর চট্টগ্রামে আক্রান্তদের বড় একটি অংশই সুস্থ হয়েছেন এ প্রয়োগের মাধ্যমে। তবুও এ বিষয়ে বেশি করে গবেষণা দরকার বলে মনে করেন কোভিড-১৯ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা।
গবেষণায় সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞতা সিভাসুর :
চট্টগ্রামের গবেষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, চট্টগ্রামে এ ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করার মতো প্রায় ১০ জনের অধিক অভিজ্ঞ গবেষক রয়েছেন। যারা বিশে^র বিভিন্ন দেশে তাদের গবেষণাসহ প্রশিক্ষণ নিয়েই এসেছেন। এর বাইরেও চট্টগ্রামে আরও বহু সংখ্যক গবেষক রয়েছেন। এরমধ্যে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি এন্ড এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ^বিদ্যালয় (সিভাসু), ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল এন্ড ইনফেকশাস ডিজিজেজ (বিআইটিআইডি) হাসপাতাল, চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় (চবি), চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় (চুয়েট) এ ভাইরাস নিয়ে কাজ করার মতো অসংখ্য বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। যদিও তাদের মধ্যে ভাইরাস বা জিনোম সিকুয়েন্স বা জীবন রহস্য উন্মোচন করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে সিভাসুর। এর আগেও প্রতিষ্ঠানটির একাধিক বিজ্ঞানী ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল, মাছের জীবন রহস্য উন্মোচন করে সফলতা দেখিয়েছেন। এর বাইরেও অনেকগুলো বিষয় নিয়ে কাজ করে সফলতা দেখিয়েছে এ বিশ^বিদ্যালয়টি।
অর্থ হলেই গবেষণা শুরু :
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি এন্ড এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) প্যাথলজি এন্ড প্যারাসাইটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. জুনায়েদ সিদ্দিকী এ প্রসঙ্গে পূর্বকোণকে বলেন, ‘সিভাসুতে গবেষণা করার মতো অবস্থান রয়েছে। শুধু সিভাসু নয়, চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়, চুয়েটসহ সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় একসাথে এ ভাইরাসটি নিয়ে কাজ করা দরকার। তাহলে এ ভাইরাসে চরিত্র ও অবস্থার বিষয়ে জানা যাবে। এতে করে চিকিৎসা পদ্ধতি যেমন সহজ হবে, তেমনি প্রতিরোধেরও কার্যক্রর ভূমিকা রাখবে। কিন্তু এটি গবেষণা করার মতো কোন অর্থই আমাদের নেই। গবেষণা করতে হলে বড় অংকের অর্থের প্রয়োজন আছে বলেও জানান তিনি’।
ভাইরাসটা আসলে কি ধরনের, তা জানা খুবই জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যেকোন ভাইরাস বয়স অনুপাতে আচরণ করে। কিন্তু আমরা এ বিষয়ে যতক্ষণ জানতে পারবো না, ততক্ষণ সবগুলোকে একই মনে করেই চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি। ভাইরাস যদি আলাদা হয়, তাহলে চিকিৎসা পদ্ধতিও আলাদা দিতে হবে। তা না হলে এটি আমাদের জন্য বড় ক্ষতি। এটি গবেষণা করতে গেলে অর্থের প্রয়োজন। আশা করছি অর্থের জোগাড় হলে আমরাও গবেষণা করতে পারবো।’
সংশ্লিষ্ট গবেষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এ ভাইরাস গবেষণার ক্ষেত্রে সর্বনি¤œ ২০ লাখ টাকার প্রয়োজন। যদিও অধিকাংশের মত, যতবেশি গবেষণা করা যাবে, ততবেশি এর আচরণ সম্পর্কে জানা যাবে। তাই অঞ্চলভেদে কমপক্ষে বিশটিরও বেশি নমুনা নিয়ে গবেষণা করা গেলে এর সুফল বেশি পাওয়া যাবে। যার জন্য অন্তত অর্ধকোটি টাকার প্রয়োজন রয়েছে। একই সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান তাদের। এরমধ্যে চুয়েট ও বিআইটিআইডি কর্তৃপক্ষেরও সহযোগিতা প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন তারা।
সহযোগিতায় প্রস্তুত বিআইটিআইডি :
এ প্রসঙ্গে বিআইটিআইডি হাসাপাতালের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান ডা. শাকিল আহমেদ পূর্বকোণকে বলেন, ‘এ গবেষণা আরও আগেই হওয়া দরকার ছিল। কিন্তু তা হয়নি। চট্টগ্রামে যথেষ্ট অভিজ্ঞ গবেষক রয়েছেন। সামান্য অর্থের যোগান পেলে তারা এ নিয়ে গবেষণা কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে সিভাসুই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের অধীনে সবগুলো বিশ^বিদ্যালয়ের গবেষকরা যদি এসে এ গবেষণার কাজ চালিয়ে যায়, এতে চট্টগ্রামের মানুষের যেমন উপকারে আসবে, তেমনি দেশও এ ভাইরাস প্রতিরোধে সক্ষম হবে। এতে বিআইটিআইডির মাইক্রোবায়োলজি বা ব্যক্তিগত যে সহযোগিতার প্রয়োজন তা দিতে কোন সমস্যা নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।’
চিকিৎসা ক্ষেত্রেও সহজ হবে :
এদিকে কোভিড-১৯ নিয়ে কাজ করা চিকিৎসকরা বলছেন, করোনার জীবর রহস্য উন্মোচন করা গেলে তার ওপর ভিত্তি করে রোগীদে চিকিৎসা সেবা দিতে সহজ হবে। একই সাথে সুস্থ হওয়ার সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে। সম্ভব হবে এ ভাইরাসটি রোধও করা যাবে। শুধু তাই নয়, চিকিৎসা পদ্ধতিরও একটি নতুন দ্বার উন্মোচন হবে বলে মনে করেন তারা।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামে কোভিড-১৯ নিয়ে কাজ করা চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. আব্দুর রব মাসুম পূর্বকোণকে বলেন, ‘এ ভাইরাসের গবেষণা বা জীবন রহস্য উন্মোচন হলে চিকিৎসা দিতে গিয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে না। বর্তমানে কিছু কিছু বিষয়ে অনুমান করেই রোগীদের সেবা দিতে হচ্ছে। যেহেতু এখন পর্যন্ত বিশে^ এ ভাইরাসের কোন ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। তবুও আমরা কিছু কমন ওষুধ প্রয়োগ করে এর ভাল ফল পাচ্ছি। তবে উন্মোচন হলে কোন মেডিসিন ব্যবহার করতে পারবো তা আমাদের জানা থাকবে। তাই এ বিষয়ে গবেষণা করা খুবই প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি’।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 198 People

সম্পর্কিত পোস্ট