চট্টগ্রাম সোমবার, ২৫ মে, ২০২০

সর্বশেষ:

করোনা নিয়েই ওরা গেলেন ঈদ বাজার করতে

৯ মে, ২০২০ | ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

ইমাম হোসাইন রাজু

লকডাউনের ঢিলে সুতোয় লাফাচ্ছে করোনা

লকডাউনের সুতোয় ঢিলে দিতেই চট্টগ্রামে করোনার গ্রাফট বদলাতে শুরু করেছে। চট্টগ্রামে মোট আক্রান্তের সিংগভাগেই গত একসপ্তাহে শনাক্ত হয়। হিসেব অনুযায়ী চট্টগ্রামে মোট আক্রান্তের মধ্যে শুধুমাত্র গত একসপ্তাহে শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা ৬৫ শতাংশের বেশি। এরমধ্যেই গতকাল শুক্রবার এক লাফে করোনা রোগী সংখ্যা দুইশ ছাড়িয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে নতুন করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত আরও ৪৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। যা চট্টগ্রামে একদিনের সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগী। এ ৪৮ জনের মধ্যে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ৩২ জন এবং পাঁচ উপজেলায় ১৬ জন রয়েছেন। তারমধ্যেই সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগী শনাক্ত হয়েছে করোনার হটস্পট হিসেবে পরিচিত উপজেলার সাতকানিয়াতেই। ২৪ ঘন্টায় দক্ষিণ জেলার এ অঞ্চলে করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৮ জন। যাদের মধ্যে পুলিশ সদস্য এবং স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন।

এদিকে, শুক্রবার করোনা রোগী শনাক্ত হওয়াদের মধ্যে একজন মৃত ব্যক্তি রয়েছেন। যিনি করোনা শনাক্ত হওয়ার আগেই মারা যান। ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুর মিছিলে নাম নেওয়া এ একজনসহ চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত করোনার বলি হওয়ার সংখ্যা ১৫ জন। যা আক্রান্তের ৭ শাতাংশের বেশি। মৃত্যুর সংখ্যা যেমন আছে, তেমনি সুখের খবর দিয়ে যাচ্ছেন করোনার চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো। চট্টগ্রামে দুই করোনা চিকিৎসাকেন্দ্রে ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪৮জন। যা আক্রান্তের দিক থেকে প্রায় ২৫ শতাংশ।

স্বাস্থ্য বিভাগের প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, শুক্রবার ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল এন্ড ইনফেকশাস ডিজিজেজ (বিআইটিআইডি) হাসপাতালের ল্যাবে সর্বমোট ১৮৩টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। তারমধ্যে ১৪ জনের ফলাফল পজেটিভ আসে। এদেরমধ্যে একজনের দ্বিতীয় নমুনা ছিল। বাকি ১৩জন নতুন করে শনাক্ত হয়। এ ১৩ জনের মধ্যে চট্টগ্রামের ১১ জন এবং বিভাগের লক্ষ্মীপুর জেলার ২ জন রয়েছেন।

এছাড়া গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি এন্ড এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ^বিদ্যালয়ে (সিভাসু) পরীক্ষা হওয়া ৬১ জনের নমুনায় ৪০ জনের পজেটিভ পাওয়া যায়। যাদের মধ্যে চট্টগ্রামের রয়েছেন ৩৭ জন। এদের ২৩ নগরীর এবং চার উপজেলার ১৪ জন রয়েছেন। এছাড়া আক্রান্ত হওয়া কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দ্বিতীয় নমুনা পজেটিভ আসে। আর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ি উপজেলার ৫২ বছর বয়সী এক নারী রয়েছেন শনাক্ত হওয়া ৪০ জনের মধ্যে।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘যতদিন যাচ্ছে তত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ২৪ ঘণ্টায় দুই ল্যাবে শনাক্ত হওয়াদের মধ্যে চট্টগ্রামেরেই ৪৯ জন। যা চট্টগ্রামের সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগী। এরমধ্যে সাধারণ মানুষ সামাজিক দূরত্ব না মেনে স্বাভাবিক ভাবে চলাফেরা করছেন। এমন অনিয়ন্ত্রিত চলাফেরায় সামনে আরও বেশি দুঃখের মধ্যে থাকতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।’

চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হওয়া রোগীরা :

নগরীর অক্সিজেননের মুরাদনগরের ৫০ বছর বয়সী বৃদ্ধ, ফৌজদারহাটের ফিল্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৪০ বছর বয়সী পুরুষ, পটিয়া উপজেলার ৩৫ বছর বয়সী পুরুষ, সাতকানিয়ায় উপজেলার মার্দাশা ইউনিয়নের ৩৮ বছর বয়সী নারী, ইপিজেডের সল্টগোলা এলাকার ৪৫ বছর বয়সী পুরুষ, কদমতলী এলাকার ৪০ বছর বয়সী পুরুষ, দেওয়ানহাট এলাকার ৪৮ বছর বয়সী পুরুষ, হালিশহর এলাকার ৪০ ও ৪২ বছর বয়সী দুই পুরুষ, পাহাড়তলী বেচা মিয়া রোডের ৬৫ বছর বয়সী পুরুষ, নগরীর পাঁচলাইশের পার্কভিউ হাসপাতালের ৭৬ বছর বয়সী বৃদ্ধ, সীতাকু-ের লালানগরের ৩২ বছর বয়সী পুরুষ, একই উপজেলার দক্ষিণ ঈদুলপুরের ৫৫ বছর বৃদ্ধ, সীতাকুন্ড থানার ২৪ বছর বয়সী কনেসটেবল, সাতকানিয়ার পশ্চিম ঘাটিয়া দিঘীর ৩৫ বছর বয়সী পুরুষ, সাতকানিয়ার ৫৫ বছর বয়সী আরেক পুলিশ কনস্টেবেল, তুলাতুলির ৩৪ বছর বয়সী পুরুষ, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের রামপুর এলাকার ২৪ বছর বয়সী যুবক, বিআইটিআইডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৭ ও ১৯ বছর বয়সী যুবক, সীতাকু-ের কুমিরা কাজীপাড়ার ৫৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ, সাগরিকার অলংকার জালাল বিল্ডিংয়ের ২৫ বছর বয়সী যুবক, বহদ্দারহাটের ফরিদাপাড়ার ২২ বছর বয়সী নারী, বাকলিয়ার কানোনগোপাড়ার ৬৮ বছর বয়সী বৃদ্ধ, হালিশহরের সবুজবাগের ১৮ বছর বয়সী যুবক, সীতাকু-ের ভাটিয়ারী এলাকার ৪৫ বছর বয়সী পুরুষ, কসমোপলিটন এলাকার ৫০ বছর বয়সী বৃদ্ধা, হাটহাজারীর মুনিরাপুকুর এলাকার ৩২ বছর বয়সী নারী, আগ্রাবাদের ৪৫ বছর বয়সী পুরুষ, সীতাকু-ের শিকপাড়ার ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ, মেহেদীবাগের ২৮ বছর বয়সী যুবক, বাকলিয়ার দেওয়ানবাজার এলাকার ৩৭ বছর বয়সী পুরুষ, নাসিরাবাদ হাউজিং এলাকার ৫৬ বছর বয়সী পুরুষ, আগ্রাবাদের মোগলটুলী এলাকার ৩৫ বছর বয়সী পুরুষ, ইপিজেডের বন্দর লেবার কলোনীর ৩৬ বছর বয়সী নারী, মধ্য হালিশহর এলাকার ৪২ বছর বয়সী পুরুষ, ফিরিঙ্গী বাজার কেবি নজরুল ইসলাম রোডের ৩৪ বছর বয়সী পুরুষ, নগরীর দামপাড়া মসজিদ গলির ৭৭ বছর বয়সী বৃদ্ধ (মৃত), বাকলিয়ার তুলাতলির মোসতাক কলোনীর ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ, ইপিজেডের কবি দিঘীর পাড়ের ৩৫ বছর বয়সী পুরুষ, মাইলের মাথা নাজের বিল্ডিংয়ের ২৭ বছর বয়সী যুবক, সদরঘাটের আইসফেক্টরী রোডের ৩৩ বছর বয়সী পুরুষ, মির্জাপুলের ইক্যুইটি ভিলেজ ভবনের ২৫ বছর বয়সী যুবক, বাকলিয়ার কল্পোলোক আবাসিকের ২ নম্বর সড়কের আল আকসা বিল্ডিংয়ের ৩১ বছর বয়সী পুরুষ, সদরঘাট থানা পুলিশের ৪৭ বছর বয়সী সদস্য, পাহাড়তলী সরাইপাড়ার ৫০ বছর বয়সী বৃদ্ধ, বাকলিয়ার ৪১ বছর বয়সী পুরুষ, সাতকানিয়ার মির্জাখিল এলাকার ২২ বছর বয়সী যুবতী ও বাজালিয়ার ৩৮ বছর বয়সী পুরুষ রয়েছেন।

গত ২৪ ঘন্টায় পরীক্ষা হওয়া ১৮৩ জনসহ বিআইটিআইডি এ নিয়ে ৪ হাজার ৫৭৬ জনের নমুনা এবং সিভাসুর ল্যাবে ৮৭৭টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। যারমধ্যে চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত ২০৬ জন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে ইতোমধ্যে ৪৮ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এবং মৃত্যু হয়েছে ১৫ জনের।

শনাক্ত হওয়ার আগেই মৃত্যু বৃদ্ধের : করোনা শনাক্ত হওয়ার আগেই চট্টগ্রামে মৃত্যু হওয়া একজনের করোনা পজেটিভ এসেছে। নগরীর দামপাড়া মসজিদ গলির ওয়াহেদুল আলম (৭৭) নামে ওই বৃদ্ধ গত মঙ্গলবার নিজ বাসায় মৃত্যু বরণ করেন। যদিও এর আগে তিনি চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা জমা দিয়ে আসেন বলে জানিয়েছেন পরিবার। এরমধ্যে গতকাল শুক্রবার তার নমুনা পজেটিভ আসে। ইতোমধ্যে ওই বৃদ্ধের বাড়িসহ আশপাশের দশটি বাড়ি লকডাউন করেছেন পুলিশ।

নিহতের ওয়াহেদুল আলমের মেয় সফিনা বেগম জানান, দীর্ঘদিন যাবত তার পিতা অসুস্থ ছিলেন। মৃত্যুর সপ্তাখানেক আগে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে কয়েকদিন চিকিৎসাও নিয়েছেন। পরে সুস্থতা অনুভব করায় বাসায় চলে আসেন তারা। এরমধ্যে গত ৩ এপ্রিল পূণরায় অসুস্থ হলে জেনালের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে চিকিৎসক তাকে দেখে নমুনা সংগ্রহ এবং ওষুধ লিখে দেন। এরমধ্যেই গত মঙ্গলবার তার মৃত্যু হয়।

আরও দুইজন সুস্থ :

করোনামুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছেন আরও দুইজন। গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশন থেকে এসব রোগীদের ছাড়পত্র দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. আব্দুর রব মাসুম। তিনি বলেন, ‘আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় পরপর দুইবার নমুনা পরীক্ষায় করোনা নেগেটিভ পাওয়া গেলে তাদের সুস্থ হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। যার কারণে আইসোলেশন থেকে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তারা নিজ বাসায় আরও ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন।’ তথ্য অনুযায়ী চট্টগ্রামে করোনা আক্রান্তদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৪৮ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

The Post Viewed By: 395 People

সম্পর্কিত পোস্ট