চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

রাজাখালী খালের তীরে বরফকল : অবৈধ স্থাপনা ‘বৈধতা’ দিল বন্দর

৭ মে, ২০২০ | ৬:২৭ অপরাহ্ণ

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

রাজাখালী খালের তীরে বরফকল : অবৈধ স্থাপনা ‘বৈধতা’ দিল বন্দর

  •  দাখিলকৃত নকশা অনুযায়ী বরফকল ও হিমাগার নির্মাণ করতে হবে। অন্যথায় লাইসেন্স বাতিল ।
  • পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধক ব্যবস্থা করতে হবে এবং পরিবেশ ছাড়পত্র নিতে হবে।

কর্ণফুলী নদী ও রাজাখালী খালের মোহনায় অবৈধ বরফকল ও হিমাগার নির্মাণের দুই বছর পর ‘বৈধতা’ দিল বন্দর কর্তৃপক্ষ। হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য, সরকারি বিধি-বিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে মৎস্য অবতরণের পাশে সরকারি জায়গায় তা নির্মাণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গত ২৭ এপ্রিল এক পত্রে বিভিন্ন শর্তে অনুমতি প্রদান করে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কর্ণফুলী নদীর চাক্তাই-রাজাখালী খালের তীরে মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের পাশে বরফকল ও হিমাগার নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। কর্ণফুলী নদীর তীরে স্থাপনা নির্মাণে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে তা নির্মাণ করা হয়। সরকারি দলের শীর্ষ স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতার ইন্ধনে এই মাছের বাজারটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, হিমাগার ও বরফকল নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর গণমাধ্যমে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর জেলা প্রশাসক ও বন্দর কর্তৃপক্ষ নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখার জন্য একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়। তারপর থেকে ছিল না অবৈধ দখল ও নির্মাণ কাজ।
গত বছরের ২ ফেব্রুয়ারি বন্দরের ডেপুটি ম্যানেজার (এস্টেট) জিল্লুর রহমান বরফকল ও হিমাগার নির্মাণ কাজ বন্ধ করার জন্য নোটিশ জারি করেছিল। নোটিশে বলা হয়েছিল, চবক’র সংরক্ষিত জায়গায় অবৈধভাবে হিমাগার নির্মাণ করা হচ্ছে। ৭ দিনের মধ্যে অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ ও নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। অন্যথায় ইজারা গ্রহীতা ইজারা শর্ত ভঙ্গ করলে ইজারা বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। কিন্তু অবৈধ নির্মাণকারীরা ইজারাদাতা প্রতিষ্ঠান বন্দর কর্তৃপক্ষের নোটিশ অমান্য করে বরফকল ও হিমাগার নির্মাণ কাজ করেছিল। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বন্দর। শেষপর্যন্ত অবকাঠানো নির্মাণের দুই বছর পর বৈধতা দিল বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দর কর্তৃপক্ষের ডেপুটি ম্যানেজার (এস্টেট) জিল্লুর রহমান স্বাক্ষরিত গত ২৭ এপ্রিলের অনুমতিপত্রের ২নং শর্তে দেখা যায়, ‘দাখিলকৃত নকশা অনুযায়ী প্রস্তাবিত হিমাগার ও বরফকল নির্মাণ করতে হবে। নকশাবহির্ভূত নির্মাণ করা হলে লাইসেন্স (অনুমতিপত্র) সরাসরি বাতিল করা হবে।’ ৬নং শর্তে দেখা যায়, পরিবেশ দূষণরোধ ও পরিবেশগত ছাড়পত্র নিতে হবে।
কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায়, দুই বছর আগ থেকেই নির্মাণ কাজ চলে আসছে। ইতিপূর্বেই বরফকল ও হিমাগারের অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হয়ে গেছে। এমনকি বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য বিদ্যুতের খুঁটিও স্থাপন করা হয়েছে। অবৈধভাবে নির্মাণ প্রক্রিয়া শেষ করার পর এখন বৈধতা পেল সেই আলোচিত মাছ বাজারের হিমাগার ও বরফকল।
বন্দর কর্তৃপক্ষের ডেপুটি ম্যানেজার (এস্টেট) জিল্লুর রহমান গতকাল পূর্বকোণকে বলেন, ‘যেহেতু ফিস ল্যান্ডিং স্টেশন, এখানে প্রচুর মাছ উঠানো-নামানো হয়। মাছ সংরক্ষণের জন্য বরফের প্রয়োজন। বোর্ড বিবেচনা করে বরফকল ও হিমাগারের অনুমতি দিয়েছে।’ নির্মাণের দুই বছর পর অনুমতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এজন্য তারা (নির্মাণকারী সংস্থা) দুঃখ প্রকাশ করেছে। মুচলেকা দিয়েছে।’
তবে অনুমতির বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান সোনালী যান্ত্রিক মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক বাবুল সরকার। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আরেক ডিলিং করছে। আমি কিছু জানি না।’ অনুমোদন দিয়েছে উল্লেখ করা হলে তিনি বলেন, ‘হয়তো দু-একদিনের মধ্যেই দিয়েছে।’
কর্ণফুলী নদীর তীরে স্থাপনা নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে চাক্তাই ও রাজাখালী খালের তীরেও স্থাপনা নির্মাণের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এছাড়াও বরফকল ও হিমাগার নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার পর পরিবেশ অধিদপ্তদর, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও (সিডিএ) নোটিশ দিয়েছে। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও সরকারি বিধি-বিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে বরফকল ও হিমাগার নির্মাণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অবৈধভাবে নির্মিত সেই হিমাগার ও বরফকলে এখন বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য বৈদ্যুতিক খুঁটি ও তার টানানো হয়েছে। নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর সংযোগ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের নেতারা।
মাছ বাজার নির্মাণের জন্য জাতীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে ভূমি ইজারা দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত বছর রমজানের ও ঈদের ব্যস্ততার মধ্যে কৌশলে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও তার টানা হয়েছে।
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কর্ণফুলী নদীর রাজাখালী খালের তীরে এই বরফকল ও হিমাগার নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছিল। দৈনিক পূর্বকোণে এই বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের পর জেলা প্রশাসন ও বন্দর ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান চালিয়ে নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। একাধিকবার কাজ বন্ধ থাকার পর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ডামাঢোলের মধ্যে কৌশলে তা কাজ শেষ করা হয়। এমনকি নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার পর বন্দর কর্তৃপক্ষ কাজ বন্ধ করে নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে নেওয়ার জন্য নোটিশও দিয়েছিল। বন্দর কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসন বার বার অভিযান চালিয়ে নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিলে কৌশলে বন্দরের কাছে নতুন করে আবেদন করে ইজারা গ্রহীতা সংস্থা।
২০১৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে ইজারা নিয়ে কর্ণফুলী নদীর চাক্তাই ও রাজাখালী খালের তীরে মৎস্য অবতরণকেন্দ্র নির্মাণ করে সোনালী যান্ত্রিক মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি। ড্রেজিং মাটি ভরাট করে এই মাছ বাজার গড়ে ওঠেছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ দুই হাজার বর্গফুট জায়গা নিজেদের ব্যবহারের জন্য রেখে এক লাখ ৭৩ হাজার ২৬৩ বর্গফুট জায়গা সমিতির নামে লিজ দেয়। কিন্তু জেলা প্রশাসনের হিসাবে ওই জায়গা আরএস খাস খতিয়ান হিসেবে রেকর্ড রয়েছে।
জেলা প্রশাসনের এক চিঠিতে দেখা যায়, ২০১৬ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আব্দুল জলিল হাইকোর্ট বিভাগের রিটের আদেশ মোতাবেক চাক্তাই ও রাজাখালী খালের তীরে উন্নয়ন, ফাইলিং, নির্মাণ কাজ, স্থায়ী ও অস্থায়ী অবকাঠানো সকল ধরনের কাজ বন্ধ এবং জরুরিব্যবস্থা গ্রহণ করে জেলা প্রশাসককে কার্যালয়কে অবহিত করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। পুলিশ কমিশনার, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ও মহানগরীর সদর সার্কেলের সহকারী (ভূমি) কমিশনারের কাছে এই চিঠি দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর সদর সার্কেলের তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) আছিয়া খাতুন একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে দেখা যায়, খাস খতিয়ানের ৮৬৫১ দাগের নদী (কর্ণফুলী নদী) শ্রেণি জমির কিছু অংশ ভরাট করে বাংলাদেশ জাতীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নামে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। সমিতির পক্ষ থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জমি ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। কর্ণফুলী নদীর ৮৬৫১ দাগ, চাক্তাই খালের ৮১৯৩ এবং রাজাখালী খালের ৬৪২৬, ৬৩৭৬ দাগ খাস খতিয়ানভুক্ত হিসেবে রেকর্ড রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের ইজারা বা ব্যবহারের অনুমতি প্রধান বোধগম্য নয়। খালসমূহে সকল ধরনের কাজ বন্ধ রাখার জন্য হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
The Post Viewed By: 295 People

সম্পর্কিত পোস্ট