চট্টগ্রাম বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

শপিং মল খোলা আত্মহত্যার শামিল : বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া

৬ মে, ২০২০ | ৮:০৯ অপরাহ্ণ

ইফতেখারুল ইসলাম

শপিং মল খোলা আত্মহত্যার শামিল : বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া

আগামী ১০ মে থেকে শপিং মলগুলো খুলে দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। সাধারণ মানুষ তাদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। এই সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীদের কিছু অংশ খুশী হলেও অনেক ব্যবসায়ীও নাখোশ। সচেতন মহল মনে করছে, এটি একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তে কিছু ব্যবসায়ী লাভবান হলেও জনগণ প্রচ-ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বেড়ে যাবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার। অপরদিকে, উপার্জনহীন এই সময়ে পরিবারের লোকজনের জন্য নতুন জামা কিনতে গিয়ে নিঃস্ব হবে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত।
গত সোমবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে মার্কেট খোলার সিদ্ধান্ত জানানোর পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। কারণ সেদিন ছিল ২৪ ঘন্টায় দেশের সর্বোচ্চ করোনা রোগী। গতকাল মঙ্গলবার তা আরো বেড়ে ৭৮৬ জন হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্য এবং করোনা রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকদের মাঝে প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে বেশি হয়েছে। তারা প্রকাশ্যে কথা বলতে না পারলেও চাপা ক্ষোভের কথা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, সবকিছু খুলে দিলে এমনিতেই আর কদিন পর হাসপাতালে জায়গা হবে না। তাই এই মুহূর্তে হাসপাতাল বন্ধ করে দিলেই তো হয়। কেউ কেউ বলেছেন, কিছুসংখ্যক ব্যবসায়ীর স্বার্থ দেখতে গিয়ে পুরো দেশকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। কারণ এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ মার্কেটে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছে। যেখানে ঈদের নামাজ ঈদগাহে পড়তে পারবে কিনা সন্দেহ রয়েছে, সেখানে নতুন জামা দিয়ে কী বা করবে। কারণ নতুন জামা পরে কারো বাসায় বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। সেখানে জামাকাপড় বিক্রির সুযোগ করে দেয়ার সিদ্ধান্তকে হঠকারী বলছেন অনেকেই। এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহবান জানান তারা।
জানতে চাইলে ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ সিকান্দর খান পূর্বকোণকে বলেন, বাজার খুলে দেয়ার অবস্থা এখনো আমাদের হয়নি। আমরা এখনো পিক-এ পৌঁছাইনি। এখনো প্রতিদিন আমাদের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। যখন কমতে শুরু করবে। ব্যবস্থার মাধ্যমে এই মহামারীকে কাবু করতে পারলে তখন ধীরে ধীরে সব খোলা যেত। আমরা খুব বেশি তাড়াহুড়ো করছি বলে মনে হচ্ছে। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। ওই ভাইরাসকে কতটুকু কাবু করতে পেরেছে তার উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। তিনি বলেন, আমরা প্রথম সুযোগটা হারিয়েছি। প্রবাসীদের বিমানবন্দরে যথাযথভাবে কোয়ারেন্টিন করাতে পারিনি। এরপর বিশ্বের অন্যান্য দেশের উদ্যোগ দেখে আমাদের সরকারও ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে দেরিতে। এরপর গার্মেন্টসের শ্রমিকদের একবার গ্রামে ফিরে যাওয়া আবার শহরে ফিরে আসার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। তথ্যমন্ত্রী আশাজাগানিয়া খবর প্রচারের জন্য গণমাধ্যম কর্মীদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। আশাজাগানিয়া খবর তখনই হবে যখন সরকারের পক্ষ থেকে সেরকম উদ্যোগ নেয়া হবে। এখন তো কাজের চেয়ে প্রচার বেশি হয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বি এ ব্যাপারে বলেন, সিদ্ধান্তটি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের। তারা যেটা ভাল মনে করেছেন সেটাই করেছেন। তবে জনগণ স্বাস্থ্যবিধি না মানলে সমূহ বিপদের আশংকা রয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক এডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী পূর্বকোণকে বলেন, এখনো মার্কেট খোলার সময় হয়নি। এটা আত্মহত্যার সামিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের মাঝে জরিপ চালিয়ে দেখেন, কেউ ঈদের নতুন জামা কিনতে রাজি না। প্রশাসন জনবান্ধব সিদ্ধান্ত না দিয়ে ব্যবসায়ীবান্ধব একটা সিদ্ধান্ত দিয়েছে। সরকারের উদ্যোগ এবং আবহাওয়ার কারণে আমরা যতটুকু বেঁচে গিয়েছিলাম মার্কেট খুলে দেয়া হলে তার চেয়ে ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করে বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে কালোবাজারি ব্যবসায়ীরা লাভবান হবে। অপরদিকে নিস্ব হবে মধ্য এবং নিন্মমধ্যবিত্তরা। কারণ কেউ একজন তার বাচ্চার জন্য ঈদের জামা কিনে নিয়ে এলে আশপাশের শিশুরাও নতুন জামার জন্য বায়না ধরবে। তখন তারা বাধ্য হবে মার্কেটে যেতে। একদিকে আয় নেই, অপরদিকে জামা কিনতে বাধ্য হওয়া। তাতে তারা মৃত্যুর ঝুঁকিতেও পড়বে আর্থিকভাবেও নিঃস্ব হবে এবং কিছু অসৎ ব্যবসায়ী লাভবান হবে। যারা ন্যায়বান ব্যবসায়ী তারাও কিন্তু এই সময়ে মার্কেট খুলতে চায় না। আগামী ১০ মে তারিখ থেকে সীমিত আকারে মার্কেট খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, সীমিত আকার বলা হলেও কেউ তা মানবে না। মানাতেও পারবে না।
বাংলাদেশ দোকান মালিক ফেডারেশন চট্টগ্রামের সভাপতি ছালেহ আহমদ সোলেমান পূর্বকোণকে বলেন, কেন্দ্রীয় কমিটি সাধারণ দোকানদারদের চাপের মুখে পড়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছে। সাধারণ ব্যবসায়ীদের যুক্তি ছিল- সরকার যেহেতু গার্মেন্টস এবং ব্যাংক চালু রেখেছে তাহলে মার্কেট খোলা রাখতে অসুবিধা কোথায়? কারণ গার্মেন্টস তো শ্রমঘন কারখানা। তারা কিভাবে চালাচ্ছে? ফেডারেশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে সরকার স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে দোকান খোলার অনুমতি দিয়েছে আগামী ১০ মে তারিখ থেকে। যারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকান খুলতে পারবে তারাই দোকান খুলবে। যারা মানতে পারবে না, তারা খুলবে না। সাধারণ মানুষের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, এটা তো কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত। এটা তার সিদ্ধান্ত নয়। তবে দোকানদারদের মাঝে পক্ষ-বিপক্ষ রয়েছে। কেউ কেউ না খোলার পক্ষে। আবার অনেকেই খোলার পক্ষে।
চট্টগ্রাম পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব মঞ্জুরুল আলম বলেন, এতে করোনা সংক্রমণ আরো বেড়ে যাওয়ার সমূহ আশংকা রয়েছে। কিছু ব্যবসায়ীর জন্য এই সুযোগ জনগণের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, যদি পরিবহন চালু না হয় তাহলে জনগণ যাতায়াত করবে কি করে ? সবকিছু বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিলে ভাল হত।
টেরিবাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান পূর্বকোণকে বলেন, বাজারের সব প্রবেশ পথে স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা রাখা হবে। যারা দোকান খুলবে তাদেরকে অবশ্যই শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। কেউ অমান্য করলে কিংবা মানতে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কাউকে ঝুঁকিতে ফেলার অধিকার কারো নেই।
বেসরকারি রিডার্স স্কুল এন্ড কলেজের চেয়ারম্যান মঈনুদ্দীন কাদের লাভলু পূর্বকোণকে বলেন, জীবন ও জীবিকা দুটোই রক্ষা করতে হবে। তবে আগে জীবন তারপর জীবিকা। এই মুহূর্তে মার্কেট, শপিং মল খোলার সিদ্বান্ত হঠকারী ও প্রতিকূল। কারণ করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির সময় বিশেষজ্ঞরা মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহকে নির্ধারণ করেছেন। প্রধামন্ত্রী দৃঢ় হস্তক্ষেপ ও মনোবল নিয়ে মোকাবেলা করে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় ছিলেন। ব্যবসায়ীদের লাভবান করে বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে কমিউনিটি ট্রান্সমিশনে ঠেলে দিয়ে যারা এ হঠকারী সিদ্বান্ত নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে, তারা সরকার ও জনগণের মঙ্গল চায় না। আশা করি সিদ্বান্তের পরিবর্তন আসবে।

পূর্বকোণ/- আরপি

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 781 People

সম্পর্কিত পোস্ট