চট্টগ্রাম শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

লকডাউনে থেমে নেই মাদক পাচার
শাহ্ আমানত এলাকায় ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ১

৪ মে, ২০২০ | ৯:১৭ অপরাহ্ণ

নাজিম মুহাম্মদ

লকডাউনে থেমে নেই মাদক পাচার

ঢাকা-চট্টগ্রামের দাউদকান্দি টোল প্লাজায় চিকিৎসকের স্টিকার লাগানো একটি প্রাইভেটকার থেকে ১৭ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এসময় গাড়িতে থাকা ডা. রেজাউল হককেও আটক করা হয়। জব্দ করা হয় চিকিৎসকের প্রাইভেটকার (ঢাকা মেট্টো-২৩-৩৭১৯)। গত ২৯ এপ্রিল কুমিল্লা গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ইয়াবাসহ এ চিকিৎসক আটক হয়। কুমিল্লার দেবিদ্বারের বাসিন্দা ডা. রেজাউল গোয়েন্দাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানান, তিনি ঢাকার উত্তরা আধুানিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্মরত। প্রাইভেটকারে চিকিৎসকের স্টিকার লাগিয়ে ডা. রেজাউল চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার থেকে ইয়াবা পাচার করতেন রাজধানীতে। তার বাবা শামসুল হক দেবিদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামের স্কুল শিক্ষক। কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ডা. রেজাউল জানিয়েছে, তিনি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার থেকে কখনো নিজে আবার কখনো লোক পাঠিয়ে ঢাকায় ইয়াবা পাচার করতেন। গাড়িতে চিকিৎসকের স্টিকার লাগানা থাকতো বিধায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ এড়িয়ে তিনি খুব সহজেই ইয়াবার চালান নির্ধারিত স্থানে আনা নেয়ার কাজ করতে পারতেন।
করোনার মহামারীতে থেমে নেই মাদক পাচার। যাত্রীবাহী যানবাহন চলাচলে বন্ধ থাকলেও থেমে নেই পাচারকারীরা। পণ্যবহনকারী পিকআপ, কাভার্ডভ্যান, এম্বুলেন্স কিংবা চিকিৎসকের স্টিকার লাগানো প্রাইভেটকারে নানা কৌশলে পাচার হচ্ছে মাদক। ইয়াবার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে ফেন্সিডিল পাচার ।
লকডাউন চলাকালে বিভিন্ন কৌশলে মিয়ানমার সীমান্ত ও আশেপাশের এলাকা থেকে ইয়াবা আসা বন্ধ নেই। আগে সীমান্ত পার হয়ে ইয়াবা আসলেও এখন বেশিরভাগ ইয়াবার উৎস হলো রোহিঙ্গা ক্যাম্প। গত একমাসের পুলিশ ও র‌্যাবের অভিযান পর্যালোচনা করে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, সাধারণ পরিবহন বন্ধ থাকায় এম্বুলেন্স ও পণ্যবাহী গাড়িতে করেই ইয়াবা আসছে টেকনাফ, উখিয়া ও আশেপাশের এলাকা থেকে। বিপরিতে দেশের অন্য এলাকা থেকে চট্টগ্রামে আনা হচ্ছে ফেন্সিডিল। দীর্ঘদিন পর চট্টগ্রামে বেশি করে ফেন্সিডিল ধরা পড়ছে। লকডাউন চলাকালে গত এপ্রিল মাসে ৭২ হাজার ৬’শ ইয়াবা ও ৪৪২ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধার করেছে র‌্যাব-৭। চলতি মাসের গত তিনদিনে উদ্ধার হয়েছে ৫০ হাজার ইয়াবা ও ৩৫৩ বোতল ফেন্সিডিল।
সর্বশেষ গতকাল রবিবার দুপুরে ভাটিয়ারি ফিলিং স্টেশনের সামনে কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামগামী কেটি কাভার্ডভ্যান থেকে ৩১১ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধার করে র‌্যাব-৭। ড্রাইভিং সিটের পেছনে ফেন্সিডিলগুলো নেয়া হয়েছিলো। এসময় আরিফ, সুমন ও জাকির হোসেন নামে তিনজনকে আটক করা হয়। সকলের বাড়ি কুমিল্লায়।
র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মশিউর রহমান জুয়েল বলেন, লকডাউনের পর থেকে ফেন্সিডিলের প্রবাহ বেড়েছে। বিগত বছরের তুলনায় লকডাউন চলাকালে ফেন্সিডিল বেশি ধরা পড়েছে। র‌্যাব অধিনায়ক জানান, গতবছর এই সময়ে যে পরিমাণ ইয়াবা ধরা পড়েছিল, এবছর তার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু ইয়াবার চালান কম ধরা পড়লেও নতুন করে আসছে ফেনসিডিল। তিনি বলেন, বিষয়টি এমন হতে পারে যে, ইয়াবার শূন্যতা পূরণ করতে নতুন করে ফেন্সিডিল আসছে।
গত শনিবার নগরীর ফিরিঙ্গিবাজার ব্রিজঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি পিকআপ ভ্যান থেকে ৫ হাজার ইয়াবাসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা পরে জানতে পারেন, ইয়াবা বহনকারী আরো একটি পিকআপ কালুরঘাট সেতু দিয়ে ভিন্ন পথে চট্টগ্রাম ত্যাগ করেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে তথ্য ছিলো- দুইটি গাড়ি ইয়াবা নিয়ে পরপর আসছে। একটি আটকের পর জানতে পারি অন্যটি গতিপথ পরিবর্তন করেছে। ফলে সেটি ধরা সম্ভব হয়নি।
পুলিশ ছাড়াও গত একমাসে র‌্যাবের অভিযানে ইয়াবা ও ফেন্সিডিলের একাধিক চালান ধরা পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম এলাকায় ফেন্সিডিলের সরবরাহ কম ছিল। গত ২৭ এপ্রিল র‌্যাব-৭ জেলার সীতাকু- এলাকা থেকে ৯৩ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধার করে। গত ২০ এপ্রিল নগরীর পাঁচলাইশ থেকে ১৯৫ বোতলসহ একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে ২৭ এপ্রিল নগরীর মুরাদপুর থেকে ৪০ হাজার ইয়াবা ও ২২ এপ্রিল নগরীর অক্সিজেন এলাকা থেকে ১০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে র‌্যাব। একইদিন হাটহাজারীর আমানবাজার থেকে ৭৬পিস ইয়াবা ও একটি বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৫ এপ্রিল উদ্ধার করা হয় ১০ কেজি গাঁজা।
ফলে দেখা যায়, লকডাউনে আন্তঃজেলা গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও ইয়াবা ও মাদক কারবারিরা তাদের কার্যক্রম ঠিকই চালু রেখেছে। গ্রেপ্তার একাধিক মাদক কারবারি পুলিশ ও র‌্যাবকে জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, লকডাউনের কারণে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার কয়েকটি এলাকায় ইয়াবার চাহিদা ও দাম দুটোই বেড়ে গেছে। এজন্য নানা কৌশলে তৎপর হয়ে উঠে ইয়াবা কারবারিরা।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত দুইবছরের সাঁড়াশি অভিযানের পর অনেক ইয়াবা কারবারি নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। অনেকে জেলে আছে আবার অনেকে ক্রসফায়ারে খুন হয়েছে। এর ফলে ইয়াবার কারবার অনেক কমে আসার কথা। বাস্তবে যে হারে মাদক ধরা পড়ছে, তাতে উদ্বেগ বেড়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর।
পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত একমাস পুলিশ নিজস্ব দায়িত্বের বাইরে লকডাউন সফল করতে অন্য কাজে বেশি ব্যস্ত ছিল। এখনো পুলিশ সেইসব কাজেই ব্যস্ত। ফলে পুরো মাসজুড়েই পুলিশের চেকপোস্ট ছিল ঢিলেঢালা। মাদক কারবারিরা সেই সুযোগ নিয়েছে।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
The Post Viewed By: 181 People

সম্পর্কিত পোস্ট