চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০২০

২৭ এপ্রিল, ২০১৯ | ৩:২৪ পূর্বাহ্ণ

মোস্তফা মোহাম্মদ এমরান

চোখের জল ফুরানোর পর আশ্রয় খুঁজে পেল সাথী

সৎ মায়ের গঞ্জনা সইতে না পেরে ছয়-সাত বছর বয়সে গৃহহারা হয় সাথী। এরপর টানা দশ-এগারো বছর কাটে চোখের জলে। ঠিকানাহীন হয়ে পড়া সাথী পেটের তাগিদে গৃহকর্মীর কাজ করে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায়। তখন শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার হয় সাথী। মানুষরূপী শ্বাপদের অত্যাচারে পালিয়ে আশ্রয় নেয় এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি। কিন্তু তার ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি। মানবিক আশ্রয় মেলেনি কোথাও। চোখের পানি ফেলতে ফেলতে কাটে দুঃসহ জীবন। একসময় ফুরিয়ে যায় চোখের জলও। সেই সাথে মুছে যায় তার সব স্মৃতি। এখন তার সৎ মায়ের নাম, পিতার নাম ও এক ভাই নুরুল ইসলামের নাম ছাড়া আর কিছুই মনে নেই। এমনকি মায়ের দেয়া পুরো নামটিও তার মনে নেই। ডাক নামটিই শুধু মনে আছে। নাম জিজ্ঞেস করলে বলে, আমার নাম সাথী। অবশেষে সাথী সম্প্রতি মানবিক আশ্রয় খোঁজে পেয়েছে। আঠারো হয়ে উঠা সেই সাথী এতবছর পর মানবিক আশ্রয় পেলো। তার জীবনের খ–কাহিনী শুনে চোখ ভিজে আসে এক আইনজীবীর। সাথী এখন অসহায় শিশু-কিশোরদের শেল্টার ওম্যান খ্যাত এডভোকেট তুতুল বাহারের হেফাজতে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম শিশু আদালত-৬ এ সাথীকে নিজ হেফাজতে নেয়ার আবেদন জানালে আদালতের জজ মো. মঈনুদ্দীন আইনজীবী তুতুল বাহারের আবেদন মঞ্জুর করেন। এখন তুতুল বাহারের মানবিক যতেœ প্রাণ ফিরে পেয়েছে সাথী। আবার প্রাণোচ্ছ্বল হয়ে উঠছে সে।
কিন্তু অতীতের অমানবিক নির্যাতনের স্মৃতি তাকে তাড়া করছে। অতীত স্মৃতি মনে পড়লেই আঁতকে উঠে সে। এত যতেœর পরেও তার মধ্যে কোন এক অজানা ভয় কাজ করছে। তার ভীতি কাটানোর জন্য তুতুল বাহার চিকিৎসকের পরামর্শ নিচ্ছেন। তাকে কাউন্সেলিং করা হচ্ছে।
সাথীর স্বজনহারা হয়ে উঠার পিছনের খলনায়িকার ভূমিকায় ছিল তার সৎ মা। চট্টগ্রাম শহরের কোন এক গিঞ্জি এলাকায় ছিল তার পরিবারের বসবাস। সাথীর দুগ্ধপান ছাড়ার পরপরই তার মায়ের মৃত্যু হয়। এরপর সিএনজি চালক পিতা শাহ আলম বিয়ে করে ঘরে তুলে আরেকজনকে। তার নাম কোহিনুর। কয়েকবছর সবকিছু ঠিকঠাক চললেও সৎ মায়ের গঞ্জনা বেড়ে যায়। বাবার অবর্তমানে সৎ মা চরম নির্যাতন চালাতো তার উপর। এ নির্যাতনের কথা বাবার কাছে প্রকাশ করে আরো সমস্যায় পড়তে হয়। সাথীর আরেক ভাই রয়েছে তার নাম নুরুল ইসলাম। এদিকে, সাথীর উপর সৎ মায়ের নির্যাতনের মাত্রা দেখে মন কেঁদে ওঠে সাথীর ফুফুর। এ ফুফুও গৃহকর্মী হিসেবে বাসা-বাড়িতে কাজ করে। তিনি একদিন চুরি করে চট্টগ্রাম শহরের পরিচিত এক বাসায় দিয়ে আসে সাথীকে। সেখানে ভালই কাটছিল এ শিশুটির। ঘরোয়া কাজ করালেও নির্যাতন করতো না ওই পরিবার। কিন্তু এ সুখ সহ্য হলো না নিষ্ঠুর প্রকৃতির। ওই বাসার পাশে একটি দোকান থেকে কিছু একটা কিনতে যায় সাথী। শিশুমনের প্রশ্রয়ে খেলাচ্ছলে একটু ঘোরাঘুরি করে সাথী। এরপর তার আর ফিরে যাওয়া হয়নি আশ্রয়স্থল হয়ে উঠা বাসাটিতে। কান্নাকাটি করতে থাকলে জনৈক ব্যক্তি তাকে নিয়ে যায়। এরপর তার কয়েক বছর কাটে কক্সবাজার জেলার চকরিয়ার একটি বাড়িতে। সেখানে শারীরিক মানসিক নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে একদিন পালিয়ে যায়। এরপর গৃহকর্মী হিসেবে কাজ জুটে চন্দনাইশের একটি বাড়িতে। সেখানেও কয়েকদিন কাজ করার পর নির্যাতন চলতে থাকে। এসব নির্যাতনের বিষয়ে সে মুখ খুলতে নারাজ। তবে, এ নির্যাতন যে শুধু কাজ আদায়ের জন্য ছিল না তার কথার অভিব্যক্তি দেখে কারোরই বুঝতে অসুবিধা হবে না।
ওই বাসার এক পুরুষ সদস্যের অযাচিত অনাকাক্সিক্ষত লালসার হাত থেকে বাঁচতে ২০১৬ সালে পালিয়ে যায় অজনার উদ্দেশ্যে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রোডে চন্দনাইশে চট্টগ্রামগামী একটি বাসে উঠে সাথী। বাসটি তাকে চট্টগ্রাম শহরের দেওয়ানহাটে নামিয়ে দেয়। ২০১৬ সালের ১৮ আগস্ট রাতে নগরীর দেওয়ানহাট মোড়ে বসে পড়ে। অজানা আতঙ্কে কান্না জুড়ে দেয়। পথচারিদের জিজ্ঞাসাবাদে সে বাবার বাসায় যাবে বলে জানায়। কিন্তু নাম-ঠিকানা জানা না থাকায় কেউ তাকে সাহায্য করছিল না। এসময় বোয়ালখালীর খরণদ্বীপের জনৈক রফিক আহমদের ছেলে রেজাউল করিমের দৃষ্টিতে আসে মেয়েটির কান্না। তিনি সাথীকে পৌঁছে দেন নগরীর ডবলমুরিং থানায়। এরপর থেকে তার নির্যাতিত জীবনের অবসান হয়েছে বলা যায়। পুলিশ জিডিমূলে তাকে আদালতে হাজির করে। তার প্রাথমিক আশ্রয় হয় মেট্রোপলিটন পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার। এরপর ফরহাদাবাদ নারী ও শিশু হেফাজত কেন্দ্রে। সাথীকে এ বছরের ১১ মার্চ আদালতের অনুমতি নিয়ে হেফাজতে নেন তুতুল বাহার।
মানুষের প্রতি তার ভীতি ও অবিশ্বাস দূর করতে সাথীকে চিকিৎসা দিচ্ছেন তুতুল বাহার। সাথী এখন মানসিক সুস্থতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। সে এখন ট্রমামুক্ত হওয়ার পথে। তাকে নিয়মিত মায়ের মমতা দিয়ে লেখাপড়াও শিখাচ্ছেন তিনি।
এডভোকেট তুতুল বাহার দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, সাথীকে আমি নিজের মায়ের মমতা দিয়েই যতœ নিচ্ছি। লেখাপড়াও শিখাচ্ছি। কাউন্সেলিং করা হচ্ছে। সে পুরো স্বাভাবিক হয়ে উঠলে তাকে কারিগরি বা হস্তশিল্পের কাজে ভর্তি করে দেব। যাতে সে ভবিষ্যতে স্বাবলম্বী হতে পারে। যেন সাথীকে অন্য কারোর গলগ্রহ হতে না হয়। কিন্তু এত যতেœর পরেও গভীর রাতে নাকি সে মায়ের জন্য কাঁদে। বাবার জন্য কাঁদে। তার ভাইয়ের জন্য ফুপিয়ে কাঁদে।
এ কান্না কি শুধু পরিবারের জন্য? না কি অন্যের গলগ্রহ থেকে ভারমুক্ত হওয়ার আকাক্সক্ষা! সাথী কি শেষ পর্যন্ত তার পরিবারের কাউকে কি খুঁজে পাবে না? সাথীর চোখের জল কি কখনো প্রাণোচ্ছ্বল হাসিতে রূপান্তর হবে না?

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 368 People

সম্পর্কিত পোস্ট