চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২০

সর্বশেষ:

শেষ পর্যন্ত খুন হলেন জামাল

৯ এপ্রিল, ২০২০ | ২:৫৮ পূর্বাহ্ণ

আল-আমিন সিকদার

শেষ পর্যন্ত খুন হলেন জামাল

হত্যাকাণ্ডে আদ্যোপান্ত

  • ঘর থেকে ডেকে নিয়ে খুন, আটক দুই ভাই
  • পূর্বে জামালের ওপর ছোড়া গুলিতে আহত হয় শিশু
  • সেই অস্ত্র উদ্ধার করে ওসিসহ ৪ পুলিশের বদলি

নিহত জামালের সাথে জমি-জমা ও ক্যাবল নেটওয়ার্ক (ডিস) ব্যবসা নিয়ে বিরোধ ছিল একই বাড়ির ইকবালের সাথে। সম্পর্কে তারা চাচাতো-জেঠাতো ভাই। দীর্ঘ ৯ বছর ধরে চলছিল তাদের এই বিরোধ। দিন যত যাচ্ছিল তত বাড়ছিল তাদের শত্রুতা। যে শত্রুতার বলি হতে হয় জামালকে। গতকাল ভোর রাতে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে ছুরিকাঘাতে খুন করা হয় জামালকে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আটক করা হয় চাচাতো ভাই ইকবাল ও তার সহোদর ইসমাইলকে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে হালিশহর থানার ওসি মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম পূর্বকোণকে বলেন, ‘জামালকে ছুরিকাঘাত করে খুনের ঘটনায় তার চাচাতো ভাই ইকবাল ও ইসমাইল নামে দুই যুবককে আটক করা হয়েছে’।
আটক দুইভাই ইকবাল ও ইসমাইল নগরীর হালিশহর থানধীন রামপুরা ওয়ার্ডের ঈদগাহ এলাকার বড় পুকুর পাড়ের মৃত ইউসুফের ছেলে। অন্যদিকে নিহত শেখ জামাল (৪২) একই এলাকার আমির আহমদ ড্রাইভারের ছেলে।
নিহত শেখ জামালের ভাই মো. কামাল পূর্বকোণকে বলেন, ‘জমি-জমার বিষয় নিয়ে গত ৯ বছর ধরে আমাদের সাথে বিরোধ চলছিল ইকবালের পরিবারের সাথে। যার কারণে প্রায়ই ইকবাল আমাদের ওপর হামলা চালাতো। গতবছরও আমার ভাই জামালকে হত্যা করতে গুলি করে ইকবাল ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী। সেই গুলি থেকে আমার ভাই জামাল বেঁচে গেলেও গুলিবিদ্ধ হয়েছিল ১২ বছরের শিশু সুমাইয়া আক্তার লিজা। এ ঘটনায় পুলিশ ইকবালকে আটক করে এবং অস্ত্রটিও উদ্ধার করে। এরপরে বিভিন্ন জায়গায় টাকা দিয়ে পুলিশের সেই অস্ত্র উদ্ধারের অভিযানটিকে মিথ্যা প্রমাণিত করে ওসিসহ সেকেন্ড অফিসারকেও বদলি করে দেয়। পরে ছাড়া পেয়ে যায় ইকবাল। জেল থেকে বের হওয়ার ৯ মাসের মাথায় গতকাল ফজরের নামাজের আগে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে খুন করা হয় আমার ভাইকে’।
কারা ঘর থেকে ডেকে নিয়ে গেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জামালের বন্ধু রাজীব ও দুলাল রাতে জামালকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে যান। আমাদের বাড়ির ৪০ গজ দূরেই একটি বাজার আছে। যেখানে ইকবাল আগে থেকেই তার সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে জামালকে খুন করার উদ্দেশ্যে অবস্থান করছিল। জামাল পৌঁছা মাত্রই সবাই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তাদের হাতে থাকা ছুরিকাঘাতে আহত হয় আমার ভাই। পরে তার চিৎকার শুনে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে হামলাকারীদের ধাওয়া দেই। আহতাবস্থায় জামাল বলেন, তার ওপর হামলা করেছে ইকবাল, রাজীব, দুলাল, নাহিদ, রফিক ও আব্দুল খালেক। এসব অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা দায়ের করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি’।
টাকার মাধ্যমে পুলিশের ওসিকে বদলি করার বিষয়ে কামালের করা অভিযোগটির সত্যতা যাচাই করতে চেষ্টা করেন এই প্রতিবেদক। তবে টাকার বিনিময়ে না হলেও এই ঘটনার কারণেই বদলি হতে হয়েছিল তৎকালীন হালিশহর থানার ওসি ওবায়েতসহ ৪ পুলিশ সদস্যকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে নিহত জামালের সাথে জনি নামে এক ব্যক্তির ঝগড়া হয়। পরে জনি গিয়ে ইকবালকে ডেকে আনার এক পর্যায়ে একটি গুলি ছোঁড়া হয়। এই গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল ১২ বছরের শিশু সুমাইয়া আক্তার লিজা। পুলিশ গুলি ছোঁড়ার অপরাধে ইকবালকে গ্রেপ্তারও করে। উদ্ধার করেন অস্ত্রটিও। তবে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাটিকে মিথ্যা ও সাজানো বলে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী কমিটির সভায় অভিযোগ করেন প্রভাবশালী একজন নেতা। বিষয়টি আমলে নিয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে একটি তদন্ত কমিটিও করা হয়। প্রভাবশালী ওই নেতার অভিযোগটি সত্যি বলে জানান তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে জেল থেকে বের হয়ে আসে ইকবাল। আর বদলি হন অস্ত্র উদ্ধার মামলার বাদি এসআই মওদুদ ও ওসিসহ হালিশহর থানার ৪ পুলিশ কর্মকর্তা। তবে শিশু লিজার পায়ে গুলি লাগার বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলেও আড়ালে থেকে যায় পুলিশের বদলি থেকে শুরু করে ইকবালের ছাড়া পাওয়ার রহস্য।
বদলি হওয়া ওসি ওবায়দুল হকের সাথে কথা হয় প্রতিবেদকের। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, ‘২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে ব্যবসায়িক দ্বন্দের কারণে জামালের ওপর হামলা চালায় ইকবাল। ইকবালের ছোঁড়া গুলিতে জামাল গুলিবিদ্ধ না হলেও গুলিবিদ্ধ হয় ১২ বছরের এক মেয়ে শিশু। যেটি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পত্রিকাগুলোসহ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এ ঘটনার পরপরই অভিযানে নামি আমরা। অভিযানে ইকবালকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি তার ব্যবহৃত অস্ত্রটিও উদ্ধার করা হয়। এ বিষয়ে তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাটি সাজানো ও মিথ্যা বলে অভিযোগ করা হয়। যা তদন্ত করতে নির্দেশ আসে পুলিশ হেড কোয়ার্টার থেকে। তদন্তে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা অস্ত্রটি ইকবালের নয় বলে উল্লেখ করা হয়। রাতারাতি বদলি করে দেয়া হয় আমিসহ ওই মামলার বাদি এসআই মওদুদ, থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই মোবারক আলম ও থানার পরিদর্শক (তদন্ত) বদরুলকে। শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম ছাড়তে হয় আমাদের’।
তদন্ত কমিটির তদন্ত নিয়ে বদলি হওয়া ওসি ওবায়দুল হকের মত সন্দেহ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রামে কর্মরত পুলিশের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র। সূত্র জানায়, ‘ডিস ব্যবসা নিয়ে জামালের সাথে দ্বন্দ্ব ছিল ইকবালের। ইকবাল জামালকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়লে সেই গুলি একটি ১২ বছরের শিশুর পায়ে বিদ্ধ হয়। যে ঘটনা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। একপর্যায়ে এ ঘটনায় জড়িত ইকবালকে গ্রেপ্তার করে হালিশহর থানা পুলিশ। উদ্ধার করা হয় ব্যবহৃত সেই অস্ত্রটি’। তবে তদন্ত কমিটির রিপোর্টের বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি এ কর্মকর্তা।
অন্যদিকে এ ঘটনায় জামালসহ তার ভাইদের আসামী করে সন্তানকে গুলি করার অপরাধে আদালতে মামলা করেছিল আহত শিশু লিজার মা ছেমনা আরা। একপর্যায়ে ছেমন আরা সেই মামলাটি মিথ্যা বলে আদালত থেকে প্রত্যাহারেরও দাবি জানান ।

The Post Viewed By: 169 People

সম্পর্কিত পোস্ট