চট্টগ্রাম বুধবার, ০৩ জুন, ২০২০

করোনায় কিডনি ডায়ালাইসিস রোগী ব্যবস্থাপনা ও এসওপি

৩ এপ্রিল, ২০২০ | ২:৪৬ পূর্বাহ্ণ

অধ্যাপক প্রদীপ কুমার দত্ত

করোনায় কিডনি ডায়ালাইসিস রোগী ব্যবস্থাপনা ও এসওপি

কোভিড-১৯ এটা এমন সংক্রামক প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ সংক্রমিত হয়ে গেছে। ৫০ হাজারের বেশি মৃত্যু। এই ভাইরাস প্রধানতঃ ফুসফুস আক্রমণ করে তবে হার্ট, কিডনি, খাদ্যনালী, ব্রেন ও রক্ত সংবহনতন্ত্রও আক্রমণ করতে পারে।
কিডনি আক্রান্ত হলে হঠাৎ বিকল হয়ে যেতে পারে। অনেক সময় কিডনি দিয়ে প্রোটিন ও রক্ত যায়। এই ভাইরাসের ক্রনিক কিডনি ফেইলুর রোগীর উপর কোন প্রভাব আছে কিনা জানা যায়নি।
এই প্যানডেমিকের সময় ডায়ালাইসিস রোগীদের কিভাবে ডায়ালাইসিস করা যাবে এ সম্পর্কে একটা গাইডলাইন দিয়েছে চাইনিজ সোসাইটি অব নেফ্রোলজি এন্ড তাইওয়ান সোসাইটি অব নেফ্রোলজি গাইডলাইন। নীচে এর বাংলাই অনুবাদ করে আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে পরিবর্তিত করে প্রকাশ করছি।
হেমোডায়ালাইসিস পেশেন্টের ব্যবস্থাপনা :
১) ডায়ালাইসিস ডাক্তার, নার্স এবং টেকনোলজিস্ট কোভিড-১৯ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান (মহামারী, সংক্রমণ, প্রতিরোধ এবং সরকারি নীতিমালা সম্পর্কে)
২) ডায়ালাইসিস স্টাফদের লিস্ট সংরক্ষণ করতে হবে।
৩) ডায়ালাইসিস পেশেন্ট, তাদের ফ্যামিলি মেম্বার, ডায়ালাইসিস স্টাফ সবার ট্রাভেল হিস্ট্রি নিয়মিত আপডেট করতে হবে।
৪) স্টাফদের ট্রেনিং অনলাইনভিত্তিক অথবা পার্সন টু পার্সন করা যেতে পারে।
৫) গ্রুপ রাউ- ও কেস ডিসকাশন পরিহার করতে হবে।
৬) স্টাফরা তাদের আহার একসাথে না করে বিভিন্ন সময়ে করতে হবে, খাওয়ার সময় কথা বলা বন্ধ রাখতে, খাওয়ার সময় মাস্ক, গগলস এবং ক্যাপ খুলে রাখতে হবে। হাত ধোয়ার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।
৭) স্টাফরা অথবা তাদের পরিবারের কোনো সদস্যের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে সাথে সাথে টিম লিডার কে জানাতে হবে।
৮) ডায়ালাইসিস রুমে প্রবেশ সংরক্ষিত করতে হবে।
৯) যথাযথ সার্জিক্যাল মাস্ক, মেশিন জীবাণুমুক্ত করা, ফ্লোর ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পরিষ্কার করা এবং এয়ার কন্ডিশনিং চালু রাখতে হবে।
১০) রোগী এবং তার সাথের লোক ডায়ালাইসিস রুমে ঢোকার আগে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে।
রোগীকে সার্জিক্যাল মাস্ক পড়তে হবে। ডায়ালাইসিসের সময় কোনো খাবার খাওয়া যাবে না। দুই একটা ক্যান্ডি খাওয়া যেতে রক্তে গ্লুকোজ লেভেল কমে যাওয়া বন্ধ করার জন্য।
১১) সন্দেহভাজন অথবা নিশ্চিত কোভিড-১৯ ইনফেকশন রোগীদের অন্যরুমে ডায়ালাইসিস করতে হবে।
১২) ডায়ালাইসিস অরিজিনাল সেন্টারেই করতে হবে, অন্য কোনো সেন্টারে যাওয়া যাবে না।
১৩) ডায়ালাইসিস শিফট পরিবর্তন করা যাবে না।
১৪) রোগীর ভাস্কুলার এক্সেস লাগলে নির্দিষ্ট রুমে সকল ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
১৫) ডায়ালাইসিস রোগীরা গণপরিবহন ব্যবহার করতে পারবে না। তারা নিজেদের পরিবহন।এবং একই রুট দিয়ে যাওয়া আসা করতে হবে। পরিবহনকারীদের অবশ্যই মাস্ক পরিধান করতে হবে।
১৬) কোনো রোগীর জ্বর দেখা দিলে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তার ডায়ালাইসিস দিনের শেষে করতে হবে।
১৭) ডায়ালাইসিস রুমে প্রবেশ এবং বাহির বিভিন্ন রোগীর জন্য বিভিন্ন সময়ে করতে হবে।
১৮) ডায়ালাইসিস সেবাদানকারী সবাইকে লম্বা হাতা জামা, ওয়াটারপ্রুফ ক্লথিং, ক্যাপ গগলস, গ্লাভস এবং মাস্ক অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে।
১৯) যদি নতুন কোনো করোনাভাইরাস ইনফেকশন রোগী সনাক্ত হয় তৎক্ষণাৎ জীবাণুনাশক ব্যবস্থা নিতে হবে এবং নিকটবর্তী স্থানে অন্য রোগীর ডায়ালাইসিস দেওয়া যাবে না।
২০) ডায়ালাইসিস রোগীর ফ্যামিলি মেম্বার কোয়ারেন্টিনে থাকলে ডায়ালাইসিস চালানো যাবে।
প্রস্তাবিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিভ প্রসিডিউর : এবার করোনা ব্যবস্থাপনার একটা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিভ প্রসিডিউর প্রস্তাবনা করছি।
১. সন্দেজনক করোনা রোগীকে দুই ব্লকে ভাগ করতে হবে। এক ব্লকে থাকবে যেসব রোগীর লাইফ সাপোর্ট লাগবে আর এক ব্লকে থাকবে যাদের লাইফ সাপোর্ট লাগবে না।
২. সম্ভব না হলে শেষের দিকের ২/৩টা বেডকে লাইফ সাপোর্টের জন্য রাখা যেতে পারে।
৩. প্রত্যেক রোগীকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কভিড-১৯ পরীক্ষা করা উচিত।
৪. কোভিড পজিটিভ আসার পর যাদের লাইফ সাপোর্ট লাগবে, তাদের সাথে সাথে ডেডিকেটেড করোনা কেয়ারে পাঠাতে হবে।
৫. দুই রোগীর মধ্যে কমপক্ষে ৬ ফুট দূরত্ব রাখা
৬. পজিটিভ রোগীর বেডে দুই দিন কোন রোগী দেওয়া যাবে না। ঐ বেডটাকে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। পরপর দু’দিন। সম্ভব হলে নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করতে হবে।
৭. নেগেটিভ হলে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে রাখতে হবে এবং পুনরায় পরীক্ষায় নেগেটিভ হলে রিলিজ করা যাবে।
৮. এবার আসা যাক লাইফ সাপোর্ট রোগী; পজিটিভ রোগীকে করোনা কেয়ারে স্থানান্তর করতে হবে। মেশিনকে জীবাণুমুক্ত করা, জীবাণুমুক্ত করার পর টানা দুই দিন এই মেশিন কোন রোগীর জন্য ব্যবহার করা যাবে না। এবং মেশিনটির নমুনা নেগেটিভ প্রমাণ হতে হবে।
৯. মেঝে দিনে দু’বার ব্লিচিং পাউডার দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
১০. পরীক্ষায় নেগেটিভ রোগীদের হাসপাতালে যথার্থ কেয়ারে স্থানান্তর করতে হবে।
১১. সাত দিন পরপর পুরা ব্লককে পরিশোধিত করতে হবে।
১২. সকল স্বাস্থ্যসেবাদানকারী কর্মীকে পিপিই পরিধান করতে হবে।
১৩. সকল স্বাস্থ্যসেবাদানকারী কর্মীর সাম্প্রতিক ভ্রমণ বৃত্তান্ত ও পারিবারিক বিবরণ সংরক্ষণ করতে হবে। সন্দেহ হলে উনাদের ও পরীক্ষা করে ডিউটি সিডিউল দিতে হবে।
১৪. যারা নন করোনা কেয়ারে থাকবেন তাদের অন্তত মাস্ক, ফুল হাতা জামা, ক্যাপ এবং গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে।
১৫. এটেন্ডেন্টকে রোগীর কাছে যেতে দেওয়া যাবে না
১৬. রুমে ঢোকা ও বের হবার সময় স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে।
১৭. প্রত্যেক ব্লক এবং করোনা কেয়ারে ডায়ালাইসিস মেশিন থাকতে হবে(ঝখঊউ হলে ভাল হয়).
১৮. সকল সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে ৫-১০টা বেড দিয়ে ব্লক করুন।
১৯. আমার প্রস্তাবিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিভ প্রসিডিউর হেপাটাইটিস বি’র ডায়ালাইসিস কেয়ার এবং চাইনিজ নেফ্রোলজি সোসাইটির প্রস্তাবিত গাইডলাইনের ভিত্তিতে।
আমাদের এখানে শনাক্তকৃত রোগী কম। সৃষ্টিকর্তার কৃপায় কমিউনিটির মাঝে বিস্তারও কম। এখনই কাজ শুরু করা যাক। সবাই অনেক অনেক ভাল থাকবেন।
* লেখক অধ্যাপক নেফ্রোলজি (প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ)

The Post Viewed By: 125 People

সম্পর্কিত পোস্ট