চট্টগ্রাম শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সাত খুনের কূলকিনারা হয়নি আজও
সাত খুনের কূলকিনারা হয়নি আজও

১ মার্চ, ২০২০ | ৩:০৮ পূর্বাহ্ণ

নাজিম মুহাম্মদ

সাত খুনের কূলকিনারা হয়নি আজও

তদন্তে অগ্রগতি নেই, এক নারীর পরিচয় মেলেনি

বছরের পর বছর পার হলেও নগরীতে সংঘটিত আলোচিত সাতটি হত্যাকাণ্ডের কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ। একাধিকবার বদলেছে তদন্ত কর্মকর্তা ও সংস্থা। কিন্তু আসামি ধরা কিংবা হত্যাকাণ্ড গুলোর রহস্য উদঘাটন কোনটিই সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ সময় মামলাগুলো তদন্ত পর্যায়ে আটকে থাকায় নিহতদের স্বজনরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।

স্কুল ছাত্রী ইনহাস হত্যা : ২০১৮ সালের ২৭ জুন বাকলিয়া থানার ল্যান্ডমার্ক আবাসিক এলাকার বাসার ভেতরে খুন হয় ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী ইনহাস বিনতে নাসির। থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তভার এখন সিআইডির কাছে। কিন্তু দুই বছরেও তদন্তে অগ্রগতি নেই। হত্যাকাণ্ডের  পর পুলিশ ইনহাসের চাচীর ছোট ভাই শিক্ষানবীশ আইনজীবী রিজুয়ানুল কবির নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছিল। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেও কিছু পায়নি। মেয়ের হত্যা মামলার তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন ইনহাসের বাবা নাছির উদ্দিন। ‘দুই বছর হতে চললেও এখনও মামলার কোনো অগ্রগতি হয়নি। একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সেও জামিনে ছাড়া পেয়েছে।’ দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা নাছির মেয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। নাছির বলেন,‘মেয়ের মৃত্যুর সংবাদ পেয়েই আমি অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম। সৌদি আরবের ভিসা বাতিল করে দেশে চলে এসেছি। এখন বেঁচে থাকা সন্তানদের নিয়ে বাকী জীবন কাটাতে চাই।’ মামলাটি সিআইডিতে তদন্তাধীন রয়েছে।
অঞ্জলী হত্যাকাণ্ড : ২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি সকালে নগরীর পাঁচলাইশ থানার তেলিপট্টি লেন এলাকায় চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজের শিক্ষিকা অঞ্জলী রানী দেবীকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। হত্যাকাণ্ডের  দিন বিকালে অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেন তার স্বামী ডা. রাজেন্দ্র চৌধুরী। শুরু থেকে মামলাটি তদন্ত করছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ।

হত্যাকাণ্ডের ছয় মাস পর পটিয়ার এক মাদ্রাসা কর্মকর্তাকে আটক করে এই মামলায় হেফাজতে নিয়েছিল পুলিশ। এরপর বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার তিন জঙ্গি ও এসপি পত্নী মিতু হত্যাকাণ্ডের অস্ত্র সরবরাহ করা এহেতাশামুল হক ভোলাকেও এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় গোয়েন্দা পুলিশ। তবে এখনও হত্যাকাণ্ডের কারণ  জানতে পারেনি পুলিশ। তবে ‘পরিকল্পিত’ এই হত্যাকাণ্ড পেশাদার খুনিদের হাতেই হয়েছিল বলে শুরু থেকেই ধারণা করছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছে সাতবার। সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে আছেন গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক বিশ্বজিৎ বর্মন। ‘মামলার নতুন কোনো অগ্রগতি নেই। হত্যাকাণ্ডে চারজন অংশ নিয়েছিল বলে প্রথম থেকেই নিশ্চিত হয়েছিল পুলিশ। তাদের শনাক্তে কাজ করছে বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা।’ এদিকে ছয় বছরেও মামলার কোনো কূলকিনারা না হওয়ায় তদন্ত নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন মামলার বাদি রাজেন্দ্র চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘শুধু হচ্ছে হবে বলা হচ্ছে। কিন্তু পাঁচ বছর ধরে কিছুই করতে পারেনি ডিবি। এমনকি হত্যাকাণ্ডের পরপরই আমাকে যে টেলিফোনে হুমকি দেয়া হয়েছিল সেটা নিয়েও একটি মামলা করেছিলাম। সে মামলাটির বিষয়েও কিছু করতে পারেনি পুলিশ।’
অঞ্জলীর দুই মেয়ে এখন সরকারি চিকিৎসক। নগরীর বাসা ছেড়ে চলে গেছেন রাজেন্দ্রও। তিনি তার বর্তমান বসবাসের স্থান জানাতে রাজি হননি।
রাজেন্দ্র বলেন,‘আমার ৬৬ বছর বয়স হয়েছে। শারীরিকভাবে অসুস্থ। নিজেও এখন প্র্যাকটিস করি না। আগে মাস তিনেক পরপর চট্টগ্রাম গেলেও এখন অনলাইনে পেনশন নিতে পারায় চট্টগ্রামেও যাই না।’

কাস্টমস কর্মী রিপেন সিংহ : ২০১৮ সালের ১২ অক্টোবর সকালে নগরীর আসকার দিঘির পাড়ের বাসা থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হন কাস্টমসকর্মী রিপেন সিংহ ধ্রুব। ওইদিন রাতে রিপেনের পরিবার কোতোয়ালী থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেন। রাতে পতেঙ্গার চরপাড়া বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হলে পরিবার তা রিপেনের লাশ বলে শনাক্ত করেন। ময়না তদন্তে রিপেনকে হত্যা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এই ঘটনায় রিপেনের বাবা ক্ষুদিরাম সিংহ তার বড়ছেলের স্ত্রী ও স্ত্রীর বড় ভাইকে আসামি করে কোতোয়ালী থানায় মামলা করেন। পরে বাদির আবেদনের প্রেক্ষিতে মামলা যায় পিবিআইতে। এর কয়েকমাস পর রিপেনের স্ত্রী, শ্বশুর, শাশুড়িসহ আরও আটজনের নাম সংযুক্তির আবেদন করে আদালতে। তবে প্রায় দুই বছর হলেও এই মামলার তদন্তে তেমন অগ্রগতি হয়নি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর পরিদর্শক জাহিদ হোসেন জানান, ‘রিপেনের বাবা বিভিন্ন সময়ে একেক জনের নাম দিচ্ছেন। প্রথমে দুইজনকে আসামি করা হলেও পরে রিপেনের স্ত্রী, শ্বশুর, শাশুড়িসহ আরও আটজনের নাম দিয়েছেন। এভাবে মোট ৩১ জনের নাম দিয়েছেন তার বাবা। ‘এভাবে বিভিন্ন সময়ে আসামিদের নাম দেয়ায় আমাদের তদন্ত ব্যাহত হচ্ছে।’ তবে মামলাটি নিয়ে তারা দ্রুত একটি সিদ্ধান্তে যাবেন বলে জানান জাহিদ হোসেন।
বিবি রহিমা খুন : ২০১৮ সালের ১ অগাস্ট নগরীর চান্দগাঁও থানার ফরিদার পাড়া এলাকায় নিজ বাসা থেকে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাংস্কৃতিক সম্পাদক এহতেশামুল পারভেজ সিদ্দিকী জুয়েলের তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বিবি রহিমার (২৭) হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন নিহতের মা বেদোরা বেগম চান্দগাঁও থানায় অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। থানা, গোয়েন্দা পুলিশ ঘুরে মামলাটির এখন তদন্তে আছে পিবিআই। হত্যাকাণ্ডের পর এহতেশামুল পারভেজ সিদ্দিকী জুয়েল সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সকালে তিনি আদালতে চলে যান। বিকালে বাসায় ফিরে ঘর তছনছ ও মেঝেতে হাত-পা বাঁধা স্ত্রীর লাশ দেখতে পান। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগের স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর রহিমাকে বিয়ে করেছিলেন জুয়েল। লাশ উদ্ধারের সময় পুলিশের তৈরি সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়, আঘাত ও শ্বাসরোধে বিবি রহিমাকে খুন করা হয়। তার গলা বাম দিকে বাঁকানো ছিল। যে ওড়নায় গলা পেঁচানো হয় সেটি দিয়েই পা বাঁধা হয়েছিল। আর লাল রঙের একটি গামছা দিয়ে পায়ের গোড়ালি বাঁধা ছিল।
ঘটনার পরপর থানা ও গোয়েন্দা পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, তারা নিশ্চিত বিবি রহিমাকে খুন করে হাত-পা বাঁধা হয়েছিল। মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছেন পিবিআইর পরিদর্শক আনোয়ার উল্লাহ। পিবিআইতে তিনি মামলাটির দ্বিতীয় তদন্তকারী কর্মকর্তা। তিনি জানান, প্রযুক্তিগত বিভিন্ন দিক নিয়ে তারা মামলাটির তদন্ত করছেন। ‘হত্যাকাণ্ডের সময় কয়জন ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত ছিল সেটা আমরা তদন্ত করছি। হত্যাকাণ্ডের অংশ নেয়া ব্যক্তিদের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারলে সবকিছু বের করা যাবে।’

কাট্টলীতে শিশু খুন : ২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে কাট্টলী বেড়িবাঁধ এলাকায় একটি সাদা কারের পেছনে থেকে একটি শিশুকে ফেলে যেতে দেখে এক নারী। খবর পেয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় তার মুখ বাঁধা ছিল। ওড়না দিয়ে বাঁধা ছিলো হাত পা। পুরো শরীরে আঘাতের চিহ্নও ছিল। পুলিশের ধারণা শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয়েছে। শিশুটিকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান আকবরশাহ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নুরুল আলম। হাসপাতালে ভর্তির পরদিন শিশুটি একবার চোখ খুলেছিলো। কিন্তু মানুষ দেখেই তার চোখ ভয়ার্ত হয়ে উঠেছিলো। কোন কথা বলতে পারছিল না। পুলিশের ধারণা, সে কারও বাসায় কাজের মেয়ে হিসেবে কাজ করত। শরীরে আঘাত করার পাশাপাশি মৃত্যুর আগে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। মেয়েটি ছয়দিন বাঁচলেও এসব বিষয়ে কিছু বলতে পারেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আকবরশাহ থানার পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শিশুটির পরিচয় জানতে দেশের সব থানায় বার্তা পাঠানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও শিশুটির ছবি দিয়ে পরিচয় জানতে সহযোগিতা চেয়েছি। এখনো পরিচয় মেলেনি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, একটি সাদা প্রাইভেটকারের পেছন থেকে শিশুটিকে ফেলে দেয়া হয়েছিলো। চেষ্ঠা করছি শিশুটির পরিচয় বের করার।
বস্তাবন্দি নারীর মৃতদেহ : ২০১৯ সালের ৬ জানুয়ারি নগরীর ডবলমুরিং থানার মোল্লাপাড়া এলাকায় বস্তাবন্দি এক নারীর মরদেহ পাওয়া গিয়েছিলো। আনুমানিক ৩০ বছর বয়সী ওই নারীকে কেউ চিনতে না পারায় পরিচয় জানা যায়নি। মোল্লাপাড়া এলাকার জনৈক ইউসুফ মিয়ার বাড়ির সীমানা দেওয়ালের ভেতরে একটি আমগাছের নিচে বস্তাবন্দি লাশটি পড়েছিলো। বিছানার চাদর মুড়িয়ে লাশটি বস্তায় ভরে চারপাশ রশি দিয়ে সেলাই করে দেওয়া হয়। ওই নারীর পরনে সালোয়ার কামিজ ছিলো। পুলিশের ধারণা ওই নারীকে খুন করা হয়েছে। ডবলমুরিং থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জহির হোসেন জানান, বস্তাবন্দী নারীর লাশের পরিচয় মেলেনি।
নুদরাত হত্যা : ২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বাকলিয়া ইছাকের পুল থেকে অপহৃত শিশু নুদরাত (৮) হত্যার ঘটনার রহস্য এখনো অজানায় রয়ে গেছে। ওইদিন বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় স্থানীয় একটি মাদ্রাসার প্রথম শ্রেণির ছাত্রী শিশু নুদরাত। ৮ফেব্রুয়ারি নিখোঁজ হওয়ার স্থান থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে চকবাজার থানার সার্সন রোডের একটি জঙ্গলে তার লাশ পাওয়া যায়। শিশুটির গলায় জুতার ফিতা পেঁচানো ছিল। আর যৌনাঙ্গ থেতলানো ছিল বলে পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়। নুদরাত হত্যা মামলা বর্তমানে তদন্ত করছেন সিআইডির পরিদর্শক (ওসি) স্বপন বড়ুয়া।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 195 People

সম্পর্কিত পোস্ট