চট্টগ্রাম রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

আরেকটি কারাগার নির্মাণের পরিকল্পনা

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ

নাজিম মুহাম্মদ

আরেকটি কারাগার নির্মাণের পরিকল্পনা

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার হ ১৮৫৩ জন বন্দীর স্থলে প্রতিদিন সাড়ে সাত হাজার বন্দীর বাস জনবল সংকট প্রকট জমি খুঁজছে কর্তৃপক্ষ

দিন দিন বন্দী বাড়ছে তবে ধারণ ক্ষমতা বাড়েনি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের। ধারণ ক্ষমতার তিনগুণ বেশি বন্দী বাস করছে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ কারাগার আয়তনের দিক দিয়ে তুলনামূলক অনেক ছোট। ১৮৫৩ জন বন্দীর ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন এ কারাগারে প্রতিদিন সাড়ে সাত হাজার বন্দী বসবাস করছে। মাঝে মাঝে বন্দীর সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় প্রায় দশ হাজারের কাছাকাছি। কারাগারের ওয়ার্ড, সেল, হাসপাতাল-কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। এ অবস্থায় চট্টগ্রামে আরো একটি কারাগার স্থাপনের জন্য জমি খুঁজছে কারাকর্তৃপক্ষ। যেটির নাম হবে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার-২।

কারাগার সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার-২ নামে আরো একটি কারাগার স্থাপনের জন্য আনোয়ারা, বাঁশখালী, বায়েজিদ এলাকায় খাস জমি খুঁজছে কারাকর্তৃপক্ষ। যেখানে কারগার ছাড়াও আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন কারগার তৈরিতে খাস জমি খুঁজতে ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করেছে কারাকর্তৃপক্ষ। ভুমি মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করে খাস জমি পাওয়া গেলেই চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার ইউনিট-২ নির্মাণ করা হবে। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে সিনিয়র জেলা সুপার কামাল হোসেন জানান, দেশের অন্যান্য কেন্দ্রীয় কারগারের তুলনায় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় করাগার আয়তনের দিক দিয়ে সবচেয়ে ছোট। তবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কারাগার। প্রতিদিন ধারণ ক্ষমতার তিনগুণ বন্দী বসবাস করে এ কারাগারে। বন্দীর সংখ্যা বাড়লেও আয়তন বাড়েনি। আমরা সর্বাতœক চেষ্টা করছি বন্দীদের সেবা দিতে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পুরুষ কারারক্ষীর অনুমোদিত পদ রয়েছে ৩৫১ ও মহিলা কারারক্ষী ১১টি। এরমেধ্য শূন্যপদ রয়েছে ১৫ জন। কারাভ্যন্তরে হাসপাতাল থাকলেও সেখানে মূলত বন্দীদের প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। গুরুতর অসুস্থ বন্দীদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) প্রেরণ করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন একজন বন্দীর পেছনে পালাক্রমে ছয়জন কারারক্ষীকে থাকতে হয়। প্রতিদিন ৮ থেকে ১০জন বন্দী চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকে। সেক্ষেত্রে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন কারারক্ষী অসুস্থ বন্দীদের পাহারারত থাকেন চমেক হাসপাতালে। এগারোজন নারী কাররক্ষী থাকলে গড়ে এক থেকে দুইজন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকে। নারী বন্দীদের পাহারা দিতে নারী কারারক্ষীদের রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়। চট্টগ্রাম কারাগার থেকে প্রতিদিন আদালত, হাটহাজারী কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র মহিলা বন্দীদের প্রেরণ করতে হয়। এছাড়া কারাগারে নিয়মিত ২৮০ জনের বেশি নারীবন্দী অবস্থান করে। প্রায় মহিলা বন্দীদের চিকিৎসা দিতে চমেক হাসাপাতালে পাঠাতে হয়।
জেল সুপার বলেন, কারাহাসপাতালে বন্দীদের সব ধরনের চিকিৎসা দেয়ার সুযোগ সুবিধা নেই। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ বন্দী চমেক হাসপাতালে পাঠাতে হয়। একজন বন্দীর পেছনে পলাক্রমে ছয়জন কারারক্ষী পাহারা থাকে। এতে জনবল সংকট আরো প্রকট হয়। ইতিমধ্যে চমেক হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় একটি প্রিজন সেল খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যেখানে শুধুমাত্র কারাবন্দী রোগীর চিকিৎসা সেবা দেয়া হবে। আশা করছি আগামী জুনের মধ্যে প্রিজনসেলের কাজ শেষ হবে। এতে ৬০ জন কাররক্ষীর স্থলে ১০ জন কারারক্ষী পাহারায় থাকলে হবে।

কারাগার সূত্রে জানা গেছে, ১৮৮৫ সালে চট্টগ্রাম জেলা কারাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ১৪ দশমিক ৮৭ একর জায়গার ওপর গড়ে তোলা হয় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার। এর মধ্যে কারাভ্যন্তরে ভূমির পরিমাণ ১৪ দশমিক ৫৫ একর। কারাগারের বাইরে ভূমির পরিমাণ পাঁচ দশমিক ৯৩ একর। কাগজে কলমে এক হাজার আটশো ৫৩ জন বন্দীর ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারগারে প্রতিদিন সাত থেকে সাড়ে সাত হাজার বন্দী বসবাস করছে।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে অনুমোদিত পদ রয়েছে ৪৬০টি। সিনিয়র জেলা সুপার একজন, প্যাথলজিস্ট ১ জন, সহকারী সার্জন (পুরুষ ও মহিলা) ২ জন, ডেপুটি জেল সুপার ১ জন, জেলার ১ জন, ল্যাবরেটরি টেকনেশিয়ান ১ জন, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ১ জন, ডেপুটি জেলার ৫ জন, মহিলা ডেপুটি জেলার ১ জন, মহিলা ডিপ্লোমা নার্স ১ জন, ফার্মাসিস্ট ৩ জন, প্রধান সহকারী ১ জন, সার্জেন্ট ইন্সট্রাক্টর ১ জন, হিসাব রক্ষক ১ জন, কারাসহকারী তথা মুদ্রাক্ষরিক ৪ জন, সর্বপ্রধান কারারক্ষী ৪ জন, চীফ মেট্রন ১ জন, প্রধান কারারক্ষী ১৫ জন, মেট্টন ১ জন, সহকারী প্রধান কারারক্ষী ৩০ জন, সহকারী মেট্রন ৩ জন, পুরুষ কারারক্ষী ৩৫১, মহিলা কারারক্ষী ১১ জন, শিক্ষক ১ জন, ফ্যাক্টরি ওভারশিয়ার ১ জন, টাস্কটেকার ১ জন, টেইলার মাস্টার ১ জন, ড্রাইভার ১ জন, বাবুর্চি ১ জন, সহকারী বাবুর্চি ২ জন, ব্লাকস্মিত ১ জন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী ৪ জন। ৪৬০ জনের পদ থাকলেও কর্মরত রয়েছে ৪২৫ জন।
এরমধ্যে তিনজন মুদ্রাক্ষরিক, প্যাথলজিস্ট, প্রধান সহকারী, সহকারী সার্জেন্ট (মহিলা), ল্যাবরেটরি টেকনেশিয়ান, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট পদ শূন্য রয়েছে।

বন্দীর সংখ্যা বাড়লেও গত ১৯ বছরে কারগারের ধারণক্ষমতা বাড়ানো হয়নি। কারা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার বন্দীর সংখ্যা ছিলো ৭৪০০ জন। বন্দী রাখতে চট্টগ্রাম কারাভ্যন্তরে পাঁচতলা বিশিষ্ট পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সাঙ্গু, কর্ণফুলী ও হালদা নামে ছয়টি ভবন রয়েছে। এ ছয়টি ভবনে ওয়ার্ড রয়েছে ১২০টি। এ ছাড়া একটি ডিভিশনপ্রাপ্ত ভিআইপি বন্দী ব্যারাক, দুটি ফাঁসির আসামির কনডেম সেল, তিনতলা বিশিষ্ট নারী বন্দী ব্যারাক, একটি সাজাপ্রাপ্ত নারী বন্দী ব্যারাক, একটি নারী কনডেম সেল, দুই তলা বিশিষ্ট একটি শিশু-কিশোর বন্দী ব্যারাক, একশ শয্যার তিনতলা বিশিষ্ট কারা হাসপাতাল- সবখানে ঠাসাঠাসি করে রাখা হয়েছে বন্দীদের । নগরীর ১৬ থানা এবং জেলার ১৬ থানাসহ মোট ৩২ থানার বিভিন্ন মামলার আসামি ও সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিকে রাখা হয় এ কারাগারে। প্রতিদিন গড়ে একশো আসামি জামিনে মুক্তি পেলেও বিভিন্ন মামলায় কারাগারে আসছে দেড় থেকে দুইশ আসামি ।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 213 People

সম্পর্কিত পোস্ট