চট্টগ্রাম শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

যানজটের ‘অক্টোপাস’ বাগমনিরাম

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৪:৩৩ পূর্বাহ্ণ

আল-আমিন সিকদার

যানজটের ‘অক্টোপাস’ বাগমনিরাম

ওয়ার্ড নম্বর : ১৫ আয়তন: ৪.৫ বর্গ কিলোমিটার জনসংখ্যা: ১ লক্ষ ৮০ হাজার ভোটার: ৩৬ হাজার ২৩৭ জন

মানুষের মৌলক চাহিদা পূরণে যে পাঁচটি চাহিদা রয়েছে তার সবই রয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ১৫ নম্বর বাগমনিরাম ওয়ার্ডে। শিক্ষার জন্য যেমন রয়েছে স্কুল-কলেজ তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ও। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগটিও এই ওয়ার্ডে। নাগরিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতকরণে রয়েছে মানসম্মত একাধিক হাসপাতাল। শুধু কি তাই, চট্টগ্রামের একমাত্র জাতীয় মসজিদ জমিয়াতুল ফালাহ ও এই ওয়ার্ডেই। আছে সনাতনী ধর্মাবলম্বীদের চট্টেশ্বরী কালি মন্দিরও।

এছাড়াও বিনোদনের জন্য আছে সিনেমা হল। শিল্প চর্চার জন্য রয়েছে শিল্পকলা একাডেমি। শিশুদের বিনোদনের জন্য রয়েছে শিশু পার্ক। খেলাধুলার জন্য রয়েছে স্টেডিয়াম। রয়েছে খাবার দাবারের জন্য অসংখ্য রেস্টুরেন্ট। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ। কিছুদিন আগেও এই ওয়ার্ডের সৌন্দর্য বর্ধনে প্রবর্তক মোড়ে বসানো হয়েছে কিংবদন্তি সঙ্গীত শিল্পী ও চট্টগ্রামের সন্তান আইয়ুব বাচ্চুর ‘রুপালি গিটার’। এক কথায়, সাড়ে ৪ বর্গকিলোমিটারের এই ওয়ার্ডটি সর্বেসর্বা। কিন্তু কথায় আছে, ‘বেশি ভালো, ভালো না’। তাইতো এই ওয়ার্ডের প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার বাসিন্দাদের এসব সুবিধার পাশাপাশি ভোগ করতে হয় যানজটের অসহনীয় যন্ত্রণা।

বাগমনিরাম ওয়ার্ডের সরেজমিন পরিদর্শনে উঠে আসে যানজটের এ চিত্র। এখানে অবস্থিত হাসপাতাল ও স্থাপনাগুলোর পার্কিং ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় সৃষ্টি হয় এ যানজটের। যার কারণ হচ্ছে, এই ওয়ার্ডের অধিকাংশ রাস্তাই খুব সরু। এছাড়াও এই এলাকার আরও একটি সমস্যা রয়েছে। সেটি হচ্ছে ফুটপাত দখলে নিয়ে হকারদের ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে কিছু নেতাকর্মীরা ফুটপাতে দখল বাণিজ্য চালিয়ে আসছে।
ওয়ার্ডের বসিন্দা মো. ফরহাদ চৌধুরী পূর্বকোণকে জানিয়েছেন তার এলাকার সমস্যাগুলো। বখাটেদের ইভটিজিং, জলাবদ্ধতা সমস্যাসহ ওয়ার্ডের ভাঙ্গা রাস্তার সমস্যার সমাধান চান। পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন মাদকের সমস্যার কথা। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে ভবিষ্যৎ কাউন্সিলরের কাছে এসব সমস্যার সমাধান পেতে চান তিনি।

একই ওয়ার্ডের বসিন্দা মো. ফাহিম পেশায় একজন ব্যবসায়ী। পূর্বকোণকে জানিয়েছেন নিজ এলাকার দৃশ্যমান সমস্যাগুলো। যার মধ্যে রয়েছে মাদকের প্রভাব। তার মতে এলাকায় কিশোর গ্যাং অন্যতম সমস্যা। এছাড়াও খেলার মাঠের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলেও জানান তিনি। এছাড়া মাদকের কাছ থেকে যুবকদের বাঁচাতে ভবিষ্যত কাউন্সিলরের কাছে হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
এসব সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন এই ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর মো. গিয়াস উদ্দিন। দিয়েছেন এসব সমস্যা সমাধানের আশ্বাসও। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, ‘গত ৫ বছরে এই ওয়ার্ডের উন্নয়নে ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। এরমধ্যে ৫৩ কোটি টাকার কাজ শেষ হয়েছে, চলমান রয়েছে ৭ কোটি টাকার কাজ। এই ওয়ার্ডে সমস্যার মধ্যে রয়েছে কেবল যানজট। রাস্তা সরু ও অপ্রতুল পার্কিং ব্যবস্থার কারণে এখানে প্রায় যানজট লেগে থাকে। এই সমস্যা সমাধানে আমার এবারের লক্ষ্য থাকবে মেহেদিবাগ সড়কটি সম্প্রসারণ করা। এছাড়া এই সমস্যার সমাধানে আমি বেশ কিছু লোক নিয়োগ করেছি, যারা ট্রাফিক জ্যাকেট পড়ে ঐ এলাকার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। এর ফলে যানজট অনেকটা কমে এসেছে।’ ফুটপাত দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি নিয়মিত এই ওয়ার্ডের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে কাজ করি। তবে রাজনৈতিক দলের পরিচয়দানকারী কিছু ব্যক্তির সহায়তায় পুনরায় দখল বাণিজ্য চলে। এই উচ্ছেদ অভিযান একটি চলমান প্রক্রিয়া। আশা করছি ধীরে ধীরে আমি এই অবৈধ স্থাপনা পুরোপরি ভাবে উচ্ছেদে সফল হবো।’
নির্বাচনী প্রস্তুতি ও মনোনয়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই ওয়ার্ডের টানা চার বারের নির্বাচিত কাউন্সিলর আমি। এবারের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি রয়েছে। আমি ১৫ নম্বর বাগমনিরাম ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি। দল থেকে মনোনয়ন চাইবো। নির্বাচনে জয়যুক্ত হলে, আবর্জনা অপসারণে ওয়ার্ডের বিভিন্ন স্থানের ডাস্টবিন সরিয়ে আলমাস সিনেমা হলের বিপরীত পাশে একটি ডাম্পিং জোন নির্মাণ এবং মেহেদিবাগ সড়ক সম্প্রসারণ করবেন বলে জানান তিনি।’

আগামী সিটি নির্বাচনে বর্তমান কাউন্সিলর মো. গিয়াস উদ্দিনের মত এই ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আওয়ামীলীগ থেকে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন চকবাজার থানা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি শেখ হারুনুর রশিদ, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন, চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের সদস্য শেখ নাছের আহমেদ, যুবলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত মো. আরিফুল ইসলাম ও বাগমনিরাম ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সদস্য শওকত উল্লাহ সোহেল। তবে দল মনোনয়ন না দিলে স্বতন্ত্র হয়ে লড়ার কথা জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন।
অন্যদিকে বিএনপির থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. রাসেল পারভেজ সুজন ও সাধারণ সম্পাদক মো. আবু ফয়েজ।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের বক্তব্য

১৫ নম্বর বাগমনিরাম ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. আবু ফয়েজ। দল নির্বাচনে অংশ নিলে বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইবেন তিনি। নির্বাচনে জয়লাভ করলে এলাকা থেকে মাদক নির্মূল, বখাটেদের উৎপাত বন্ধ করা, কাজির দেউড়ি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়কে উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত বর্ধিত করাসহ নতুন দু’টি বিষয়ের উপর প্রাধান্য দিচ্ছেন তিনি। এগুলো হলো, অসহায় ও গরীবদের জন্য ফ্রি এম্বুলেন্স সার্ভিস প্রদান এবং গরীবদের বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
বিএনপি থেকে আরো মনোনয়ন চাইছেন ১৫ নম্বর বাগমনিরাম ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. রাসেল পারভেজ সুজন। মনোনয়ন পেলে তিনি প্রথমবারের মত নির্বাচনে অংশ নিতে চান। তার ইচ্ছা আছে এলাকার যানজট নিরসনে, ফুটপাতের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূলে কাজ করা। পাশাপাশি নিজ উদ্যোগে খেলার মাঠ নির্মাণের ইচ্ছাও আছে তাঁর।
শেখ হারুনুর রশিদ চকবাজার থানা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি। আগামী চট্টগ্রাাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামীলীগ থেকে মনোনয়ন পেলে প্রথমবারের মত কাউন্সিলর পদের প্রার্থী হতে চান তিনি। নির্বাচিত হলে নাগরিকদের সুবিধা নিশ্চিত করা সহ চারটি বিষয়ের উপর প্রধান্য দিচ্ছেন তিনি। এগুলো হল, জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান করা, অনুন্নত রাস্তার সংস্কার করা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও খেলার মাঠ নির্মাণ।
চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের সদস্য শেখ নাছের আহমেদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের ধারা বাগমনিরাম ওয়ার্ডবাসীর ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে কাজ করতে চাই। এখানে পরিবেশ দূষণ, বায়ু দূষণ, শব্দদূষণ, যানজট নিরসনে বেসরকারি হাসপাতাল, স্কুল, অসংখ্য ফ্ল্যাট বাড়ির মালিক ও প্রশাসনের সমন্বয়ে কাজ করতে চাই।’

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, দল থেকে মনোনয়ন না পেল স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করবো। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের এই সাবেক সহ-সম্পাদক এবারই প্রথমবারের মত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাইছেন। নির্বাচিত হলে এলাকার সংকীর্ণ রাস্তা প্রশস্ত করা, মহিলাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, পথশিশুদের জন্য নৈশকালীন স্কুল নির্মাণসহ এলাকার মাদকাসক্তদের জন্য রিহ্যাব সেন্টার নির্মাণের আশা রয়েছে তাঁর।
ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সদস্য শওকত উল্লাহ সোহেল বলেন, ‘আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জয়লাভ করলে বর্তমান সরকারের গণমুখী উন্নয়নে জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করে এই ওয়ার্ডে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় সকল সেবা জনগণের দোর গোড়ায় পৌঁছে দেওয়া আমার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। পাশাপাশি ফুটপাত দখলমুক্ত, মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূলে কাজ করবো।’

যুবলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত মো. আরিফুল ইসলাম মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন আওয়ামীলীগ থেকে। মনোনয়ন পেলে প্রথমবারের মত নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন পূর্বকোণকে। তবে মনোনয়ন না পেলে লড়তে চান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। অন্যদের মত তিনিও এলাকা থেকে জলাবদ্ধতা নিরসন, মাদক নির্মূল, রাস্তার সংস্কার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করতে চান। এছাড়াও রাস্তার উপর অবৈধ পার্কিং এর বিরুদ্ধে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন বলে জানিয়েছেন।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 311 People

সম্পর্কিত পোস্ট