চট্টগ্রাম সোমবার, ০১ জুন, ২০২০

সংঘর্ষের ঘটনাই বার বার শিরোনাম

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৭:২৩ পূর্বাহ্ণ

আল-আমিন সিকদার

সংঘর্ষের ঘটনাই বার বার শিরোনাম

এলাকাবাসীর দাবি নিরাপদ লালখানবাজার চাই

লালখান বিহারী। চট্টগ্রামের যে ওয়ার্ডটি লালখান বাজার নামে পরিচিত। জনশ্রুতি রয়েছে, লালখান বিহারীর নামেই এ ওয়ার্ডটির নামকরণ করা হয়। শুধু তাই নয়, স্থানীয়দের মতে এই ওয়ার্ডটির আরও একটি পরিচিতি রয়েছে সেটি হচ্ছে শহীদ নগর। তাঁরা জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রামের মধ্যে সব থেকে বেশি মানুষ শহীদ হয়েছিল এই এলাকায়। তাইতো এই এলাকাটি শহীদ নগর নামেও পরিচিত। এই নামে লালখান বাজার ওয়ার্ডে একটি স্কুলও রয়েছে।
পাহাড়ের বুক চিরে গড়ে ওঠা এই ওয়ার্ডটিতে দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে পানির ট্যাংক। একসময় পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই ট্যাংক থেকেই পুরো এলাকায় পানির সরবরাহ করা হত। তবে এখন এই ট্যাংকের ব্যবহার কমলেও দূর-দূরান্ত থেকে এটিকে দেখতে আসেন দর্শনার্থীরা। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ১৪ নম্বর ওয়ার্ড লালখানবাজার। ৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই ওয়ার্ডে প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। একসময় লালখান বিহারীর নামে নামকরণ হওয়া এই লালখানবাজার এখন প্রায়শই রক্তে লাল হয়। আধিপত্য বিস্তারের খেলায় মেতে ওঠা রাজনৈতিক নেতাদের কারণে এখানে চলতে থাকে গ্রুপে গ্রুপে সংঘর্ষ। শুধু কি তাই, এখানে এত বেশি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে যে স্থানীয়রা ঘরে বসে বলে দিতে পারেন- কোনটা গুলির শব্দ আর কোনটা আতশবাজির। গণমাধ্যমগুলোতেও এসব আন্দোলন আর সংঘর্ষের কারণে প্রায়ই শিরোনামে থাকে লালখানবাজার।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চাঁদাবাজি-মাদক আর দখল-বাণিজ্য করায়ত্ত করার লড়াই থেকে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তাইতো সংঘর্ষের মধ্যে থাকা এলাকাবাসী আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নেতাদের এই রেষারেষি থেকে মুক্তি চান। দাবি জানান একটি নিরাপদ লালখান বাজারের।
অত্র ওয়ার্ডের স্থায়ী বসিন্দা মো. জসিম উদ্দীন। প্রায় ১৯ বছর ধরে বসবাস করার সুবাদে বিভিন্ন সময় মুখোমুখি হয়েছেন বিভিন্ন সমস্যার। বর্তমানে যে সমস্যাগুলো চরম অসহনীয় সেগুলোর কথা জানিয়েছেন পূর্বকোণকে। তিনি বলেছেন ওয়ার্ডের ভাঙ্গা রাস্তা, অপরিচ্ছন্ন নালা-নর্দমার কথা। পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন মাদকের সমস্যার কথা। মাদক ব্যবসায়ীরা গোপনে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করছে এমন অভিযোগ তার। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে ভবিষ্যৎ কাউন্সিলরের কাছে এইসব সমস্যার সমাধান চান তিনি। চান নিরাপদ লালখান বাজার।

একই ওয়ার্ডের বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন সিদ্দিকি। পেশায় আইনজীবী। জন্মসূত্রে পাহাড়তলী ওয়ার্ডে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন তিনি। পূর্বকোণকে জানিয়েছেন নিজ এলাকার দৃশ্যমান সমস্যাগুলো। যার মধ্যে রয়েছে মাদকের প্রভাব। তার মতে, এলাকায় আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এই সমস্যার প্রধান কারণ। তার অভিযোগ রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন হলেও ড্রেনেজ ব্যবস্থা এখনও অনুন্নত। এছাড়া তিনি মনে করেন মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব রয়েছে ভাসমান ও ছিন্নমূল জনগণের জন্যে। এই সমস্যাগুলোসহ বিশুদ্ধ পানির ঘাটতি পূরণে ভবিষ্যত কাউন্সিলরের হস্তক্ষেপ চান তিনি।
এলাকাবাসীর এ অভিযোগের সত্যতা জানতে আমরা কথা বলেছি বর্তমান কাউন্সিলর এ এফ কবির আহমেদ মানিকের সাথে। প্রথমেই জানতে চেয়েছি অধিপত্য বিস্তার নিয়ে ধারাবাহিকভাবে ঘটতে থাকা সংঘর্ষের বিষয়ে। পাশাপাশি প্রশ্ন ছিল এলাকার সমস্যা নিয়েও। আর এসব বিষয় নিয়ে তিনি পূর্বকোণকে বলেন, ‘৮ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের বরাদ্দ পেয়েছি। এরমধ্যে কিছু অর্থ দিয়েছেন বর্তমান নগর পিতা, আর কিছু অর্থ দিয়েছেন আফসারুল আমিন এমপি সাহেব। আমার সময়কালে আমি এলাকার প্রত্যেকটি রাস্তা পাকা করেছি। ৩ টি স্কুল নির্মাণ ও এর সংস্কার করেছি, মতি ঝর্ণাতে ৩টি মসজিদ নির্মাণ করেছি এবং বাগঘোনাতে একটি মসজিদের কাজ চলমান রয়েছে।’ মাদকের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আগে মতি ঝর্ণা এলাকায় মাদকের প্রভাব খুব বেশি ছিল, তবে বর্তমানে এই মাদককে মোটামুটি সহনশীল পর্যায়ে আমরা নিয়ে আসতে পেরেছি। আর এই মাদকের প্রসারের পেছনে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরাই।’ প্রায় সময় লালখান বাজারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে হওয়া সংঘর্ষের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘খারাপের সাথে কোনো আপোস হয় না। যে সংঘর্ষগুলো হয় সেগুলো অবশ্যই মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। যারা দলের নাম ভাঙ্গিয়ে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি করে তারাই নিজের ফায়দা হাসিল করার জন্যে এইসব মারামারি করে।’

আগামী সিটি নির্বাচনে বর্তমান কাউন্সিলর এ এফ কবির আহমেদ মানিকের মত এই ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুম ও চট্টগ্রাাম মহানগর আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবকলীগের সদস্য আবুল হাসনাত মো. বেলাল।

বিএনপির থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন নগর বিএনপির যুগ্ন-সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম শাহ আলম।
আবুল হাসনাত মো. বেলাল বলেন, ‘দল থেকে মনোনয়ন পেলে নির্বাচন করবো। নির্বাচিত হলে নাগরিকদের সুবিধা নিশ্চিত করতে ৭টি বিষয়ের উপর প্রাধান্য দিবো। এগুলো হল- মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূল করা, আধিপত্য বিস্তারের সংস্কৃতি বন্ধ করা, মতিঝর্ণায় উচ্ছেদকৃত ভাসমান জনগণকে পুনর্বাসন করে দেয়া, নিজ উদ্যোগে খেলার মাঠ ও সুবিধাবঞ্চিতদের জন্যে কর্মমুখী প্রশিক্ষকেন্দ্র নির্মাণ।’
দিদারুল আলম মাসুম বলেন, আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেলে প্রথমবারের মত নির্বাচনে অংশ নিবো। নির্বাচিত হলে মতিঝর্ণা এলাকা থেকে মাদক নির্মূলসহ ছয়টি বিষয়ের উপর জোর দিয়েছেন তিনি। যেগুলো হল- শিক্ষার মান উন্নয়নে শহীদ নগর স্কুলকে কলেজ পর্যন্ত বর্ধিত করণ, ওয়াসা ও লালখান বাজার মোড়ে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ, ১০ তালা নতুন কাউন্সিলর ভবন নির্মাণ ও একই ভবনে লালখানবাজারের ব্যবসায়ীদের ব্যবসার সুযোগ করে দেয়া, আধুনিক সুবিধা সমৃদ্ধ ক্রীড়া একাডেমি নির্মাণ।

নগর বিএনপির যুগ্ন-সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম শাহ আলম বলেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে দল থেকে মনোনয়ন চাইবো। মনোনয়ন পেলে দ্বিতীয়বারের মত লড়ার আশা ব্যক্ত করেছেন তিনি। এর আগে ২০১৫ সালে প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। নির্বাচনে জয়লাভ করলে মাদক নির্মূল, অনুন্নত রাস্তার সংস্কার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ একটি বিষয়ের উপর প্রাধান্য দিচ্ছেন তিনি। সেটি হল এলাকা থেকে সন্ত্রাস নির্মূল করে এই ওয়ার্ডেও বাসিন্দাদের নিরাপদ ও সুন্দর ওয়ার্ড উপহার দেওয়া।

The Post Viewed By: 274 People

সম্পর্কিত পোস্ট