চট্টগ্রাম সোমবার, ২৫ মে, ২০২০

প্রিয় চট্টগ্রামকে বাঁচাবে কে ?

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ আলী

আইন আছে প্রয়োগকারীও আছে, নেই শুধু পদক্ষেপ

প্রিয় চট্টগ্রামকে বাঁচাবে কে ?

আইন আছে, প্রয়োগকারীও আছে। কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেই। এ কারণে সবকিছুতে একটা বেসামাল অবস্থা। ফলে সরকারের উন্নয়নের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন হচ্ছে না। শিল্পকারখানার নির্গত বর্জ্য বন্ধের জন্য ইটিপি স্থাপনের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ শিল্পকারখানার ক্ষেত্রে এ নিয়ম ব্যত্যয় হচ্ছে। এ কারণে শিল্প কারখানার বর্জ্য সরাসরি নালা ও খাল হয়ে হালদা ও কর্ণফুলী নদীতে পড়ছে। এতে দূষিত হচ্ছে এ দুই নদী। জলাবদ্ধতা নিরসনে নগরীর নালা ও খাল সংস্কার ও উন্নয়ন কাজ করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এসব কাজে নালা ও খাল থেকে উত্তোলনকৃত মাটি পড়ে থাকে সড়কে। কিন্তু যথাসময়ে মাটি সরানো না হওয়ায় ভোগান্তি বাড়ে জনগণের। পাহাড় কাটা বন্ধের নিয়ম থাকলেও যথাযথ প্রয়োগের অভাবে কাটা বন্ধ হচ্ছে না পাহাড়। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কসমূহে সংস্কার ও উন্নয়ন কাজ করা হচ্ছে। কিন্তু সড়ক উন্নয়ন শেষ হলেও বৈদ্যুতিক পুলগুলো যথাসময়ে সরানো হয় না। তাতে সড়ক সংস্কার কাজের সুফল পায় না জনগণ। নিষিদ্ধ থাকলেও নগরী ও জেলায় পলিথিনের ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে। মাঝে মাঝে পরিবেশ অধিদপ্তর অভিযান চালালেও তা বেশিরভাগ হয় দোকানে। ফলে পলিথিনের ব্যবহার কমছে না। পলিথিন তৈরির কারখানায় অভিযান চালানো হলে এটির ব্যবহার অনেকখানি কমতো বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন জনগণ। নগরীতে এমনিতে খোলা মাঠ কিংবা খালি জায়গার সংখ্যা কম। মার্কেট এবং দোকান করার প্রবণতার কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে। অপরদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পরও নগরীতে কমছে না মাদকের

ব্যবহার। খেলাধুলার মাঠ না থাকায় তরুণ ও যুবকরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। সেবা সংস্থাসমূহের কাজের সমন্বয়হীনতার কারণে নগরী ধুলোয় ধূসর। এতে নগরজীবনে ঘটছে স্বাস্থ্যহানিও। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, চট্টগ্রামে পাহাড় কাটা, শিল্পকারখানার বর্জ্যে নদী, শব্দ ও বায়ু দূষণসহ নানাভাবে পরিবেশ দূষণ বাড়ছে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় অভিযান নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের। পরিবেশের সাথে সংশ্লিষ্ট লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নদীর আশপাশে গড়ে ওঠা সাত শতাধিক ছোট-বড় কলকারখানার হাজার-হাজার টন বর্জ্যে নাভিশ্বাস ওঠা নগরবাসীর পাশাপাশি মরণদশা দেশের লাইফলাইন খ্যাত কর্ণফুলী নদী। এছাড়া শিল্প ও আবাসিক এলাকায় শব্দ দূষণের মাত্রা ছাড়িয়েছে দ্বিগুণের বেশি। শিল্পকারখানা ও যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়ায় অতিমাত্রায় দূষিত হচ্ছে বায়ু। একই সঙ্গে জাহাজ কাটা শিল্পে বিষাক্ত গ্যাস, অগ্নিকা- এবং যন্ত্রাংশের নিচে চাপা পড়ে গত এক দশকে মারা গেছে অন্তত ১৫০ শ্রমিক। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কর্ণফুলী নদীকে কেন্দ্র করে নদীর দু’পাড়ে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় প্রায় সাতশ’ শিল্পকারখানা। এসব কারখানার নির্গত বর্জ্যে বিপন্ন হতে চলেছে কর্ণফুলী নদীর প্রাণ। কর্ণফুলী পেপার মিল (কেপিএম), রেয়ন মিল, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল), কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো), ডাই সুপার ফসফেট (টিএসপি), তেল পরিশোধন প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড, বিপণন সংস্থা পদ্মা, মেঘনা, যমুনার ডিপো, চিটাগাং ড্রাই ডক লিমিটেড, সিমেন্ট কারখানাসহ দুই শতাধিক কারখানাকে মারাত্মক দূষণকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। তালিকার শীর্ষে রয়েছে চারটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম ওয়াসা, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা (সিইউএফএল) ও কর্ণফুলী পেপার মিল (কেপিএম)। প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো বর্জ্য শোধনাগার নেই। তাই প্রতিনিয়ত বর্জ্য পড়ছে কর্ণফুলীতে। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে বারবার ইটিপি কার্যকরে তাগাদা দেওয়া হলেও তারা তা বাস্তবায়ন করছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কর্ণফুলী নদীতে সবচেয়ে বেশি বর্জ্য ফেলে সরকারি চার প্রতিষ্ঠান, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা ও কর্ণফুলী পেপার মিলস। এর মধ্যে শুধু সিটি কর্পোরেশনই প্রতিদিন ৭৬০ থেকে ৮০০ টন বর্জ্য ফেলছে। কর্ণফুলী নদীর পাড়ের অধিকাংশ শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধন যন্ত্র বা ইটিপি নেই। যেসব প্রতিষ্ঠানের ইটিপি আছে তারাও এ যন্ত্র ব্যবহার করে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
নগরীতে কোনো স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা নেই। ফলে নগরীর আশপাশের প্রায় ৬০ লাখ মানুষের মলমূত্রসহ আবর্জনাগুলো বিভিন্ন খাল ও নালা হয়ে সরাসরি কর্ণফুলীতে গিয়ে পড়ছে। পার্বত্য অঞ্চলের কাপ্তাই, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, বোয়ালখালী উপজেলা, চট্টগ্রাম বন্দরসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলের ওপর দিয়ে কর্ণফুলী নদী প্রবাহিত। প্রতিদিন গড়ে ত্রিশ লাখ লিটারের মতো পয়ঃ ও গৃহস্থালি বর্জ্য গিয়ে পড়ছে কর্ণফুলীতে।

নদী দূষণ প্রসঙ্গে ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্প পরিচালক ও ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজের ওপর চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রণীত মাস্টার প্ল্যানের তথ্য অনুযায়ী নগরীর দৈনিক ২৮ কোটি ৮০ লাখ লিটার তরল বর্জ্য পড়ছে হালদা ও কর্ণফুলী নদীতে। ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্প না থাকায় এসব বর্জ্য সরাসরি নালা ও খাল হয়ে এ দুটো নদীতে পড়ছে। এতে নদী দুটি ভয়াবহ দূষণের শিকার হচ্ছে। অথচ এ দুটি নদী ওয়াসার সুপেয় পানির প্রধান উৎস। এছাড়াও প্রণীত মাস্টার প্ল্যানের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে নগরীতে দৈনিক প্রায় ৫৩৯ ঘনমিটার ফিক্যাল স্লাজ জমা হচ্ছে। যা আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতিদিন প্রায় ৭১৫ ঘনমিটারে উন্নীত হবে। নগরীতে বর্তমানে সিটি কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনায় প্রতিদিন ১৫ ঘনমিটার ফিক্যাল স্লাজ সংগ্রহের ব্যবস্থা রয়েছে এবং এনজিও সংস্থা ডিএসকে এর পরিচালনায় প্রতিদিন ২০ ঘনমিটার ফিক্যাল স্লাজ পরিশোধন ব্যবস্থা আছে।

ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘ওয়াসার স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা না থাকায় নগরীর সব রকমের বর্জ্য সরাসরি নালা ও খাল হয়ে হালদা ও কর্ণফুলী নদীতে পড়ছে। এতে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। অথচ এ দুটি নদী ওয়াসার সুপেয় পানির প্রধান উৎস। বর্তমানে কর্ণফুলী ও হালদা নদী থেকে দৈনিক ৩২ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। চলতি ২০২০ সালের মধ্যে কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প-২ এর মাধ্যমে দৈনিক আরো ১৪ কোটি লিটার এবং নদীর দক্ষিণ পাড়ে ভা-ালজুড়ি প্রকল্পের মাধ্যমে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দৈনিক ৬ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করা হবে। তাই বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে স্যুয়ারেজ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’

দূষণ প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মোহাম্মদ মোয়াজ্জম হোসাইন বলেন, ‘সর্বশেষ ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে পরিবেশ অধিদপ্তর নিষিদ্ধ পলিথিনের বিরুদ্ধে ৭৩টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে। এর মধ্যে ৮৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অপরদিকে, কারখানার বর্জ্য, শব্দ, বায়ু ও জাহাজভাঙ্গা শিল্পে দূষণের দায়ে প্রায় ৫০০টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এনফোর্সমেন্ট অভিযান চালানো হয়। তাতে ৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়।’
অপরদিকে, পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরীর উপ পরিচালক মিয়া মাহমুদুল হক দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘নগরীতে কারখানার বর্জ্য, শব্দ, বায়ু ও জাহাজভাঙ্গা শিল্পে দূষণসহ বিভিন্ন কারণে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত তিন বছরে ৫৯৮টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৬৪৬টি অভিযান চালানো হয়। এতে ৬ কোটি ৮৮ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়।’

The Post Viewed By: 113 People

সম্পর্কিত পোস্ট