চট্টগ্রাম শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২০

সর্বশেষ:

পাহাড়খেকোদের রাজত্ব কক্সবাজারে

২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ১:২৪ পূর্বাহ্ণ

আরফাতুল মজিদ, কক্সবাজার

৫১ জনের সিন্ডিকেটে ২৭ পাহাড় কেটে সাবাড়

পাহাড়খেকোদের রাজত্ব কক্সবাজারে

৩৯টি অবৈধ পিকআপ দিনে-রাতে সাবাড় করছে কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ও পিএমখালী ইউনিয়নের ২৭টি পাহাড়।

গত তিন মাস ধরে ৩৯টি পিকআপ নিয়ে সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন এসব পাহাড় নিধনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে ৫১ জনের একদল পাহাড়খেকো সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে থাকা ৩৯টি অবৈধ পিকআপে দিনে-রাতে প্রকাশ্যে চলছে পাহাড় কেটে মাটি ও বালি পরিবহন। তারা ইতিমধ্যেই পাহাড়ের মাটি বিক্রি করে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। রহস্যজনক কারণে প্রকাশ্যে দিনে-রাতে পাহাড়ের মাটি নিয়ে ৩৯টি অবৈধ পিকআপ ভ্যান সড়ক ও মহাসড়ক দিয়ে যাতায়াত করছে নির্বিঘেœ। কিন্তু স্থানীয় বনবিভাগ সেখানে এক প্রকার অসহায়। বনকর্মীদের বেশ কয়েকদফা ধাওয়া, গুলি করে মারার হুমকিও দেয়া হয়েছে। কিন্তু বন মামলা করে তা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। যার কারণে পিএমখালী ও খুরুশকুল এখন এক ভয়ংকর এলাকায় পরিণত হয়েছে। সেখানে পাহাড়খেকোদের রাজত্বে দিশেহারা সাধারণ মানুষও।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পিএমখালী ইউনিয়নের তোতকখালী, সিকদারপাড়া, সতেরকাটা, মাঝের পাড়া, ছয়ভাইয়ের পাড়া, পুরাকাটা, সিকদারঘোনা, কাঠালিয়ামোরা, চেয়ারম্যানঘাটা, তাহের মোহাম্মদের ঘোনা, সাতঘরিয়া পাড়া, ছনখোলা, নয়াপাড়া, ঘোনা পাড়া, মাদলিয়া পাড়া, পাহাড়তলী, খুরুশকুল ইউনিয়নের তেতৈয়ার ইউছুফ ফকির পাড়া, রুহুল্লার ডেইল, ডেইল পাড়া, আদর্শ গ্রাম, তেতৈয়া, ঘোনা পাড়া, পূর্ব হামজার ডেইল, মেহেদী পাড়া, নতুন ঘোনা পাড়া, ফকিরের দোকান, ঝিলংজা ইউনিয়নের দক্ষিণ হাজীপাড়া গ্র্রামে ২৭টি পাহাড় নিধন চলছে প্রকাশ্যে। এসব এলাকার পাহাড়গুলোতে একে একে ৩৯টি পিকআপ লাগিয়ে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কক্সবাজার শহরসহ বিভিন্ন এলাকায়। সেখানে নিচু এলাকায় অসংখ্য প্লট ভরাট করা হচ্ছে টাকার বিনিময়ে। নেয়া হচ্ছে খুরুশকুল আশ্রয়ন প্রকল্প এলাকায়ও। ওইসব নিচু এলাকা ভরাটে মাটিখেকোরা সব পাহাড়ই সাবাড় করে দিচ্ছে প্রকাশ্যে। কিন্তু এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সব বিভাগই একপ্রকার নীরব ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। এলাকাবাসী অভিযোগ করে জানান, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় থেকে শহরের প্রবেশপথ, বাংলাবাজার থেকে পিএমখালী সড়ক এবং খুরুশকুল ব্রিজ দিয়ে প্রতিদিন প্রকাশ্যে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩৯টি পিকআপ নিয়ে পাহাড় কেটে মাটি পরিবহন করা হচ্ছে। খুরুশকুল ব্রিজে প্রতিদিন যানজট লেগেই থাকে মাটিভর্তি পিকআপের কারণে। এসব মাটি ভর্তি পিকআপের কারণে পথচারীরাও দুর্ভোগে আছেন। এমনকী মাটিভর্তি পিকআপের ধাক্কায় এ পর্যন্ত ৭/৮ জন মানুষ মারা গেছেন। আহত হয়েছেন অনেকেই। এরপরও মাটি ভর্তি পিকআপ চলছেই। প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এসব অবৈধ কর্মযজ্ঞ চলছে অবাধে। মাঝে-মধ্যে প্রশাসনের বড় কর্তারা অভিযান চালালেও পরে আবার ওই কাজ শুরু করে সিন্ডিকেটের সদস্যরা।

সংশ্লিষ্ট প্রশাসনসূত্রে জানা গেছে, পাহাড় কেটে মাটি পরিবহনে ব্যবহৃত ৩৯টি পিকআপ গাড়ির মালিক হচ্ছেন যথাক্রমে ঝিলংজার হাজীপাড়ার জাহেদ, শফি, মৌলভীপাড়ার মনছুর, পিএমখালীর ডিকপাড়ার মোস্তাক, তুষার, আমান উল্লাহ, নয়াপাড়ার আলম, কাদের, আবদুল্লাহ, হারুন, পরানিয়াপাড়ার ওবায়দুল, নুরুল আমিন, তোতকখালীর কায়েস, ফয়সাল, আমজাদ, জাসেদ, আক্কাছ, শাহজাহান, খুরুশকুলের কাওয়ারপাড়ার কায়ছার, মামুন, মনিরুল, কুলিয়াপাড়ার জিয়াবুল, নবাব মিয়া, রফিক, লামাজিপাড়ার নাছির, তেতৈয়ার ইউছুপ ফকিরপাড়ার বাবুল, কক্সবাজার শহরের টেকপাড়ার নাছির উদ্দিন রুনু, ফরিদ কোম্পানি, জয়নাল, এহছান, কলাতলী আদর্শগ্রামের সেলিম উল্লাহ সুমন ও নুনিয়াছড়া মগচিতাপাড়ার লম্বা জাহাঙ্গীর অন্যতম।
নির্বিচারে পাহাড় কাটার বিষয়ে পরিবেশবাদী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘এনভায়রনমেন্ট পিপল’র প্রধান নির্বাহী রাশেদুল মজিদ বলেন, সম্প্রতি সংগঠনের একটি দল খুরুশকুল, পিএমখালী ও ঝিলংজার ২৭টি পাহাড় কাটার স্থান পরিদর্শন করে পাহাড় কাটার ভয়াবহ চিত্র দেখতে পায়। পাহাড় কেটে বেশ কিছু পিকআপ (ডাম্পার) যোগে মাটি বিক্রি করা হচ্ছে দেদারছে। যা এক সময় ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনবে। এভাবে পাহাড় কাটার কারণে পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হচ্ছে। এটি উদ্বেগজনক। এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণে স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বন মামলা দিয়ে পাহাড় কাটা রোধ করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে।

প্রকাশ্যে পাহাড় নিধনের বিষয়ে জানতে চাইলে পিএমখালী রেঞ্জে’র রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ইতিমধ্যেই ৮০টি মামলা দেয়া হয়েছে। কয়েকটি গাড়িও জব্দ করা হয়েছে। এরপরও পাহাড় কাটা বন্ধ করা যাচ্ছে না। উল্টো গুলি করে মারার হুমকি দিচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ-পরিচালক শেখ মো. নাজমুল হুদা বলেন, আমি নতুন এসেছি। পাহাড় কাটলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. আশরাফুল আফসার বলেন, পাহাড় কাটা রোধে প্রশাসন কঠোর। ইতিমধ্যেই পাহাড় কাটায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে ইউএনও এবং এসি (ল্যান্ড)কে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, পিএমখালী ও খুরুশকুল ইউনিয়নে ২৯টি গ্রামের ৪০টি পাহাড়ের অধিকাংশের একাংশ কেটে ফেলা হয়েছে ইতিমধ্যেই। এর আগে গত দুই বছরে ওই এলাকায় প্রায় ৩০টি পাহাড় কেটে সাবাড় করে ফেলা হয়েছে। ওইসব পাহাড়ের চিহ্নও এখন সেখানে আর নেই।

The Post Viewed By: 63 People

সম্পর্কিত পোস্ট