চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

গাউছুল আজম মাইজভা-ারীর ১১৪তম বার্ষিক ওরশ সম্পন্ন

২৫ জানুয়ারি, ২০২০ | ৪:৪৫ পূর্বাহ্ণ

এস.এম.মোরশেদ মুন্না হ নাজিরহাট

আখেরি মোনাজাতে লাখো লাখো ভক্তের অংশগ্রহণ

গাউছুল আজম মাইজভা-ারীর ১১৪তম বার্ষিক ওরশ সম্পন্ন

‘অলিগণ রাসূলের প্রতিনিধি’

লাখোলাখো ভক্তের উপস্থিতিতে তরিকায়ে মাইজভা-ারীর দিকপাল গাউছুল আজম মাইজভা-ারী হযরত শাহ্সূফী আল্লামা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভা-ারী প্রকাশ ‘হযরত কেবলা’র বার্ষিক ১১৪তম ওরশ শরীফ ধর্মীয় ভাবগাম্ভিয্যের মধ্যদিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ফটিকছড়ির মাইজভা-ার দরবার শরীফে সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল (শুক্রবার) মধ্যরাতের আখেরি মোনাজাতের মধ্যদিয়ে তিন দিন ব্যাপী ওরশের সমাপ্তি ঘটে। দরবারের প্রত্যেক মঞ্জিলে আলাদা আলাদাভাবে আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। স্ব-স্ব মঞ্জিলের সাজ্জাদানশীনগণ আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন। গত বুধবার (২২ জানুয়ারি) হতে শুরু হওয়া তিনদিন ব্যাপী ওরশ ব্যাপক কর্মসূচি নিয়ে মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়। বৃহস্পতিবার (২৩ জানুয়ারি) গাউছে মাইজভা-ারী মাজার গোসল শরীফ, খতমে কোরআন, গিলাপ চড়ানো ও মিলাদের মাধ্যমে ওরশের আনুষ্ঠানিক শুভ সূচনা হয়। ওরশে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ভক্তরা দরবারে আসেন। ভক্ত অনুরক্তদের পদচারণায় দরবার শরীফ এলাকা ছিল লোকে লোকারন্য। দূর-দূরান্ত হতে আগত ভক্তরা স্ব-স্ব মঞ্জিলের অস্থায়ী ক্যাম্পে অবস্থান করেন। ওরশে ভক্তরা মাজার হতে মাজারে ছুটোছুটি করে কোরানখানি, জেয়ারত, মিলাদ, জিকিরে ছেমা ও ভা-ারী গানের মধ্যদিয়ে সময় পার করেন। এদিকে তিন দিন ব্যাপী ওরশে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ভক্তদের জানমাল নিরাপত্তা বিধানে নাজিরহাট হতে দরবার পর্যন্ত এবং দরবারের আশপাশে প্রশাসনিকভাবে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল। সার্বিক আইন-শৃংখলা রক্ষায় একজন ভ্রাম্যমাণ ম্যাজিস্ট্রেট, বিপুল সংখ্যক পুলিশ, মহিলা পুলিশ, আনসার-ভিডিপি ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী মোতায়েন ছিল। দরবারের শাহী ময়দানে হযরত সাহেব কেবলার আওলাদদের মধ্যে দুই দফা আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। আখেরি মোনাজাতে দেশ বরেণ্য আলেম ওলামা ও বিপুল ভক্ত জায়েরীনগণ উপস্থিত ছিলেন।

গাউছিয়া আহমদীয়া মঞ্জিল (শাহ এমদাদীয়া) : সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভা-ারী বলেন, ‘অলিগণ রাসূলের প্রতিনিধি। তাদের কারণে ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম প্রচার ও প্রসার লাভ করেছে। ইসলামের ক্রান্তিলগ্নে সবসময় ছুফিসাধকরাই ধর্মের আধ্যাত্মিক ও শরীয়তের অবকাঠামো রক্ষকের ভূমিকায় অবর্তীর্ণ হয়েছেন। ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসারের পাশাপাশি ইসলামের মৌলিক আদর্শ ও বিশ্বাসের সাাথে সমাজ সংস্কৃতির নৈতিক সংস্কারে আধ্যাত্মিক পূর্ণতা লাভের কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘গাউছুল আজম মাইজভা-ারী শাহছুফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.) মাইজভা-ারী ত্বরিকা প্রবর্তন করেছেন। মাইজভা-ারী ত্বরিকা ইসলামের মৌলিক আদর্শ ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির মেলবন্ধনের চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক রূপ। এ ত্বরিকার অনুসারীরা ঐশি প্রেমনির্ভর শিক্ষা ও ইসলামী শরীয়তভিত্তিক চর্চায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
আঞ্জুমানে মোত্তাবেয়ীনে গাউছে মাইজভা-ারী (শাহ এমদাদীয়া) কেন্দ্রীয় কার্যকরী সংসদের সচিব শেখ মুহাম্মদ আলমগীরের পরিচালনায় ওরশে মিলাদ পরিচালনা করেন দারুত তায়ালীম প্রধান শিক্ষক মওলানা জয়নাল আবেদীন ছিদ্দিকী।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সাবেক মন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, খান এগ্রো প্রোডাক্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দুল হক খান, মাইজভা-ারী ফাউন্ডেশনের কো-চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন সৈয়দ সোহেল হাসনাত, জহিরুল ইসলাম চৌধুরী ও সৈয়দ ফজলুল কাদের, আওলাদে গাউছুল আজম সৈয়দ এরহাম হোসাইন ও সৈয়দ মানাওয়ার হোসাইন।

গাউছিয়া আহমদিয়া মঞ্জিলের নায়েব সাজ্জাদানশীন সৈয়দ ইরফানুল হক মাইজভা-ারী (ম.)’র সার্বিক তত্ত্বাবধানে মাইজভা-ার ওরশ শরীফ সুপারভিশন কমিটির বিপুলসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক ও মাইজভা-ারী স্পেশাল ফোর্স (এমএসএফ) দায়িত্ব পালন করেন।
এদিকে বা’দ এশা থেকে মাইজভা-ার দরবার শরীফের শাহী ময়দানে বয়ানে শানে মোস্তফা (দ.) ও শানে গাউসুলআজম মাইজভা-ারী মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। আঞ্জুমানে মোত্তাবেয়ীনে গাউছে মাইজভা-ারীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভাপতি আলহাজ শাহসুফি ডা. সৈয়দ দিদারুল হক মাইজভা-ারী (মঃ)’র সদারতে পূর্ব সিলসিলা অনুযায়ী আখেরি মোনাজাত পরিচালিত হয়।

মোনাজাতের পূর্বে তিনি বলেন, ‘ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, তদুপরি সমগ্র বিশ্ব আজ অস্থির, অশান্ত। তৃষ্ণাতুর মানবজাতি আজ শান্তি ও মুক্তির জন্য উন্মুখ, দিশেহারা। কঠিন ঈমানি পরীক্ষার এই যুগে মহান আল্লাহর মনোনীত নায়েবে রাসুল অর্থাৎ আউলিয়া কেরামের দীক্ষিত প্রেম ও সাম্যবাদী জীবনদর্শনকে শক্তভাবে ধারণ, লালন ও চর্চা করতে হবে। তিনি বলেন, ‘মাইজভা-ার শরীফ এবং এই তরিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা সমস্ত কুপ্রথা, কুসংস্কার, বিকৃতি এবং বিভ্রান্তি থেকে মুক্তির জন্য অছি এ গাউসুল আযম শাহসুফি সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভা-ারীর দিকনির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণের বিকল্প নেই। তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণে আমিত্ব অহমিকা পরিহারপূর্বক খাতেমুল আউলিয়া গাউসুল আযম মাইজভা-ারী (কঃ) এর প্রবর্তিত মানবতাবাদী মাইজভা-ারী তরিকা দর্শন অনুসরণের মাধ্যমে এই বিশ্বের বুকে শান্তি ও সাম্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
খাদেমানদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন গাউছিয়া আহমদিয়া মঞ্জিলের নায়েব মোন্তাজেম ও ওরশ শরীফ সুপারভিশন কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী শাহজাদা সৈয়দ হোসেইন রাইফ নুরুল ইসলাম (রুবাব) মাইজভা-ারী।

গাউছিয়া রহমান মঞ্জিল : হযরত কেবলার ওরশ উপলক্ষে ব্যাপক ভক্তের সমাগম ঘটে রহমান মঞ্জিলের শাহসূফি আলহাজ মুজিবুল বশর মাইজভা-ারীর দরবারে। ভক্তরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে বাবার সাথে দেখা করে নেক মকছুদ হাসিলের চেষ্টা করে। গাউছিয়া রহমান মঞ্জিলে আনুষ্ঠানিকভাবে রাত ১২টায় দরবারের পূর্বের বাড়িতে আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। আখেরি মোনাজাতে তিনি বলেছেন, কোরআন- সুন্নাহর ভিত্তির উপর মাইজভা-ারী তরিকা প্রতিষ্ঠিত। এই তরিকা নবী আর অলি প্রেমীদের। নবী প্রেমীরাই অলিকে ভালবাসে। যারা অলি মানে না তারা নবীও মানে না।
বয়ান শেষে বিশ্ব মুসলমানের শান্তি সমৃদ্ধি কামনা করে শাহসূফি আলহাজ মুজিবুল বশর মাইজভা-ারী আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন। এতে উপস্থিত ছিলেন, শাহাজাদা সৈয়দ নুরুল বশর আল-হাচানী আল মাইজভা-ারী, মৌলানা দিদারুল হক মাইজভা-ারী, মৌলানা জাকির হোসাইন, মৌলানা মফিজুর রহমান, মৌলানা নিজামুল হক, জামাল উদ্দিন ও আব্দুস সালাম সরকার।

গাউছিয়া মঈনীয়া মঞ্জিল : ওরশ উপলক্ষে আন্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভা-ারীয়া ব্যাপক কর্মসূচি পালন করে। রাতে অনুষ্ঠিত মাহফিলে সভাপতিত্ব করেন আন্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভা-ারীয়ার সভাপতি মাইজভা-ার দরবার শরীফের গাউছিয়া রহমানিয়া মইনীয়া মঞ্জিলের সাজ্জাদানশীন শাহ্সূফী মাওলানা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী (মা.)। তিনি বলেন, মাইজভা-ার দরবার শরীফ অসাম্প্রদায়িকতা চর্চার পাদপীঠ। মানুষে মানুষে মিলন ও সম্প্রীতির ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণাদায়ী দর্শনই হচ্ছে মাইজভা-ারী দর্শন। জাত পাতের পার্থক্য, মানুষে মানুষে বিভেদ, অনৈক্য, বৈষম্য ও হানাহানির বিপরীতে মাইজভা-ারী দর্শন শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিক ঐক্যের বার্তাই দেয় বিশ্ববাসীর সামনে।
এতে অতিথি ও আলোচক ছিলেন হযরত সৈয়দ মইনুদ্দীন আহমদ মাইজভা-ারী ট্রাস্টের মহাসচিব কাজী মহসীন চৌধুরী, খলিফা আল্হাজ কবীর চৌধুরী, শাহ্ মোহাম্মদ আলমগীর খান, আহসানুল কবীর রিপন, চান্দিনা পৌরসভার মেয়র আলমগীর খান মাইজভা-ারী, মাওলানা মুফতী সালেহ সুফিয়ান মাইজভা-ারী, মাওলানা বাকের আনসারী, মাওলানা নঈম উদ্দীন, আন্জুমান চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি খলিফা মো. বোরহান উদ্দীন, মোতাহের মিয়া চেয়ারম্যান।
মিলাদ-ক্বিয়াম শেষে আখেরি মুনাজাত পরিচালনা করেন শাহ্সূফী মাওলানা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী (মা.)।
গাউসিয়া হক মঞ্জিল : ওরশ উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। মধ্যরাতে কেন্দ্রীয় মিলাদ মাহফিল, আখেরি মোনাজাত ও তবারুক বিতরণের মাধ্যমে কর্মসূচি শেষ হয়। আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন গাউসিয়া হক মঞ্জিলের সাজ্জাদানসীন, আওলাদে গাউসুল আযম হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভা-ারী (মা.)। এছাড়াও শাহানশাহ্ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভা-ারী ট্রাস্ট’র উদ্যোগে ১০ দিনব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে ছিল ‘ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্বলিত দুর্লভ চিত্র ও ভিডিও প্রদর্শনী’।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 416 People

সম্পর্কিত পোস্ট