চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

জ্ঞান ও মানবসম্পদই সমৃদ্ধির সোপান

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ১:২১ পূর্বাহ্ণ

ড. অনুপম সেন

জ্ঞান ও মানবসম্পদই সমৃদ্ধির সোপান

প্রথম আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকে ইতালির বোলনায় ও ফ্রান্সের প্যারিসে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী মিলিত হয়ে সংঘ সৃষ্টির মাধ্যমে (এই সংঘকে বলা হয় ইউনিভার্সিটাস) এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা ব্যক্তি উদ্যোগেই। এইসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পঞ্চম শতকে রোমান সাম্রাজ্য উপজাতীয় আক্রমণে ধ্বংস হওয়ার পর পাঁচশ বছর ব্যাপী ইউরোপে যে অন্ধকার যুগ নেমে এসেছিল তার অবসানের পর। ‘অন্ধকার যুগে’ প্রায় পুরো ইউরোপে শিক্ষার আলো সম্পূর্ণভাবে নিভে গিয়েছিল বলা চলে। অষ্টম-নবম শতকে ক্যারোলিনজিয়ান সম্রাট শার্লামেন পশ্চিম ইউরোপের বিশাল অংশ নিয়ে নতুন সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। এই কারণে পোপ ৮০০ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে ‘হলি রোমান এম্পারার’ ঘোষণা করেন। এই শার্লামেন এবং ইংল্যান্ডের আলফ্রেড দ্য গ্রেট, যিনি ইংল্যান্ডকে এক করেছিলেন, দু’জনেই পড়তে শিখেছিলেন তাঁদের উত্তর যৌবনকালে। ইউরোপজুড়ে অশিক্ষার এই সর্বব্যাপী অন্ধকারের মধ্যেই দ্বাদশ শতকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সূচনা ঘটেছিল। ইউরোপে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সূচনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পুঁজিবাদের বিকাশ।
দ্বাদশ শতক থেকে ইউরোপজুড়ে যতই প্রাচ্যের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং অন্তর্বাণিজ্যের বিকাশ ঘটেছে, উৎপাদন শক্তির বিকাশ ঘটেছে, ততই সেখানে নতুন নতুন পেশা ও কর্মের সৃষ্টি হয়েছে। এইসব পেশা ও কর্মের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিরও বিকাশ ঘটেছে, জ্ঞানেরও অগ্রগতি হয়েছে। এই অগ্রগতিরই পরোক্ষ ফল হিসেবে নানা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা শুরু হয়। ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইউরোপে সই করতে পারতেন এমন লোকের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এই সংখ্যা হল্যান্ড, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানিতে বিপুল পরিমাণে বেড়ে যায়। এইসব দেশে তা ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশে উন্নীত হয়। ইউরোপে যে দেশে যত বেশি শিক্ষিত সৃষ্টি হয়েছে, দেখা গেছে সে দেশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ততই বিপুলভাবে এগিয়ে গেছে। এইসব দেশে নব প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্তার ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির মুখ্য মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে।
বর্তমানেও দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার ক্ষেত্রে যে দেশ যত বেশি এগুচ্ছে, সে দেশই বিশ্বে নেতৃত্বের ভূমিকায় এগিয়ে আসছে। বর্তমানে চীন ও ভারতে লোকসংখ্যা যথাক্রমে ১৪০ কোটি ও ১৩০ কোটি। ৫০-এর দশকের প্রথমে ভারত ও চীনের জিডিপির মধ্যে তেমন বড়ো কোন পার্থক্য ছিল না। কিন্তু আজ পার্থক্যের পরিমাণ বিশাল। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত সবচেয়ে অগ্রগামী অর্থনীতি হলেও চীনের তুলনায় তার উন্নয়ন সামান্য। চীনের বর্তমান জিডিপি হলো ১৪ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, ভারতের প্রায় আড়াই ট্রিলিয়ন ডলার। এর প্রধান কারণ শিক্ষাকে চীন যেভাবে গুরুত্ব দিয়েছে, তা ভারত থেকে অনেক বেশি। ভারত বর্তমানে জিডিপির ২.৬ শতাংশ খরচ করে শিক্ষায়, চীন করে ৪ শতাংশ। চীন গত অর্থবছরে শিক্ষায় খরচ করেছে ৫৬৫ বিলিয়ন ডলার, যেখানে ভারতের খরচ মাত্র ৫৭ বিলিয়ন ডলার। তাই এটাই স্বাভাবিক যে, চীন এগিয়ে যাবে। তাই দেখা যাচ্ছে, বর্তমান বিশ্বে গবেষণার ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান যেখানে ১ নম্বরে, যুক্তরাষ্ট্র ২ নম্বরে, ভারত ৫ নম্বরে।
সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখে না, আজকের বিশ্বে যদি একটি দেশকে এগোতে হয়, সে দেশকে এগোতে হবে জ্ঞানসমৃদ্ধ হয়ে। জাপানের উদাহরণ থেকে আমরা বলতে পারি, জাপান কৃষিতে এবং খনিজ সম্পদে অত্যন্ত দীন হওয়া সত্ত্বেও কেবলমাত্র মানবসম্পদ বা জ্ঞান সৃষ্টির মাধ্যমে এই সেদিন (২০১৪) পর্যন্ত বিশ্বের ২য় সমৃদ্ধ অর্থনীতি ছিল; বর্তমানে চীন। মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে অবশ্য চীন এখনও জাপান থেকে অনেক পিছিয়ে। কারণ, চীনের জনসংখ্যা ১৪০ কোটি, জাপানের মাত্র ১৩ কোটি। অর্থনীতিবিদগণের বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে, জাপানের সমৃদ্ধির পেছনে মানবসম্পদ বা হিউম্যান ক্যাপিটালের অবদান অর্থাৎ জ্ঞানের অবদান ৮৫ শতাংশ।
প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিও বাংলাদেশকে জ্ঞান-সমৃদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে প্রাক্তন মেয়র ও মানবতাবাদী রাজনৈতিক নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০০১ সালের ডিসেম্বর মাসে। তাই প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির লক্ষ্য কেবল জ্ঞান অর্জন নয়, জ্ঞান সৃষ্টিও করতে হবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের; এই লক্ষ্যে ও আদর্শে তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি ডিগ্রিকে যথার্থ মূল্য দিলেও আরো বেশি মূল্য দেয় তাদের শিক্ষার্থীরা যেন জীবনের ক্ষেত্রে এই ইউনিভার্সিটি থেকে তাদের অর্জিত জ্ঞানকে ব্যবহার করতে পারে। এই কারণে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি শিক্ষার মান বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেয়, গুরুত্ব দেয় তাত্ত্বিক (ঃযবড়ৎরঃরপধষ) জ্ঞানকে ব্যবহারিক (বসঢ়রৎরপধষ) প্রয়োগে ঋদ্ধ করতে ।
আমাদের এই ইউনিভার্সিটিতে ১০টি বিভাগ আছে। বিভাগগুলোর অধীনে ১৪টি প্রোগ্রাম হলো: ১.ব্যাচেলর অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন (বি.বি.এ.) ২. ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) ৩. ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ইলেক্ট্রিকাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) ৪. ব্যাচেলর অব আর্টস (অনার্স) ইন ইংলিশ ৫. ব্যাচেলর অব ল’স এলএল.বি. (অনার্স) ৬. ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচার ৭. ব্যাচেলর অব সায়েন্স (অনার্স) ইন ম্যাথমেটিক্স ৮. ব্যাচেলর অব সোশ্যাল সায়েন্স ইন ইকোনোমিক্স ৯. মাস্টার অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন (এম.বি.এ.)-২বছর ১০. মাস্টার অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন (এম.বি.এ.)-১বছর ১১. এক্সিকিউটিভ মাস্টার অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন (ই.এম.বি.এ.)-১ বছর ৬ মাস ১২. মাস্টার অব আর্টস ইন ইংলিশ ১৩. মাস্টার অব সোশ্যাল সায়েন্স ইন ইকোনোমিক্স ১৪. মাস্টার অব ল’স (এলএল.এম.)।
প্রতিটি বিভাগই সাধ্যমত চেষ্টা করছে, এই ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা যেন জ্ঞান অর্জন করতে পারে, যে জ্ঞানকে তারা উত্তর জীবনে বা কর্মজীবনে আরও সমৃদ্ধতর করবে। ইউনিভার্সিটি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত ২০৬ জন শিক্ষক এবং অতিথি শিক্ষক হিসেবে আরও ১৩০ জন, মোট ৩৩৬ জন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানে নিয়োজিত রয়েছেন। এসব দক্ষ শিক্ষকদের কারণে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির শিক্ষার মান বর্তমানে অসামান্য। উদাহরণ স্বরূপ, ২০১৭ সালের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত বার কাউন্সিল পরীক্ষায় যেখানে পাসের হার মাত্র ৩০ শতাংশ, সেখানে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের পাসের হার প্রায় ৯০ শতাংশ। প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির শিক্ষার মান অসামান্য হওয়ায় বর্তমানে রাষ্ট্রের বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে এই ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করা ছাত্র-ছাত্রীরা দায়িত্ব পালন করছেন। দেশ-বিদেশের কর্মজীবনের হাজারো ক্ষেত্রে এই ইউনিভার্সিটি থেকে বাণিজ্য, প্রকৌশল, ইংরেজি, অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ে ডিগ্রিপ্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রীরা সাফল্যের সঙ্গে কর্মরত রয়েছেন। এছাড়াও এই ইউনিভার্সিটির বিপুল সংখ্যক পাস-করা-শিক্ষার্থী ও ইউনিভার্সিটি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক দেশ-বিদেশে পিএইচডিসহ অন্যান্য উচ্চতর গবেষণায় নিযুক্ত রয়েছেন।

লেখক ঁ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সমাজবিজ্ঞানী ও উপাচার্য ও প্রফেসর, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 254 People

সম্পর্কিত পোস্ট