চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকে অনিরাপদ সবজি

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ১২:৪২ পূর্বাহ্ণ

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকে অনিরাপদ সবজি

সবজি উৎপাদনে ক্ষতিকারক রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার ক্রমে বাড়ছে। রোগবালাই, পোকা-মাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা, উৎপাদনের নিশ্চয়তা ও বৃদ্ধির জন্য শাক-সবজি ক্ষেতে মানদ- ছাড়াই কীট-নাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। খাদ্যের উৎস স্থান থেকে পরিবহন ও গুদামজাতে রাসায়নিক মেশানো হয়। এরফলে খাদ্যের উৎস আর নিরাপদ থাকছে না। জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে মাটির ঊর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। এছাড়াও কীটনাশক ব্যবহারে অসতর্কতায় হুমকিতে কৃষকের জীবনীশক্তি।
দেখা যায়, জমিতে সবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে বিভিন্ন ধরনের কীট-নাশকের ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে সবজি ও ধান উৎপাদনে বেশি পরিমাণে রাসায়নিক সার ও কীট-নাশকের ব্যবহার বেশি হয়। ফসল উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে কীট-নাশকের ব্যবহার বাড়ছে। এর ফলে খাদ্যের উৎস আর নিরাপদ থাকছে না। উৎপাদন ছাড়াও পরিবহন ও গুদামজাতেও রাসায়নিক মেশানো হয়। এতে সবজি উৎপাদন বিষাক্ত হয়ে উঠেছে।
সবজি উৎপাদনে অনেক এগিয়ে বাংলাদেশ। কৃষক ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি-সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যৌথ প্রয়াস এই সাফল্য। সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্বখাদ্য সংস্থা খাদ্য নিয়ে দুই ধরনের ঝুঁকি চিহিৃত করেছে। তা হল : জীবাণু সংক্রান্ত দূষণ (বিভিন্ন ধরনের জীবাণু, ছত্রাক ইত্যাদি)। এ ধরনের দূষিত খাদ্য মানবদেহে বিভিন্ন বিরূপ উৎসর্গের সৃষ্টি করে। ২. রাসায়নিক দ্রব্য দ্বারা দূষণ। এর মধ্যে রয়েছে পরিবেশ দূষণ সংক্রান্ত, ভারি ধাতু অথবা অন্যান্য অবশিষ্টাংশ-অগোচরে খাদ্যে অনুপ্রবেশ করে। দূষিত খাদ্যে বিষের মাত্রা ও পরিমাণ এবং সময়Ñকালসহ ভিন্ন হয়।
বিশ্বখাদ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) অংশিদারত্বের ভিত্তিতে নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক নীতি প্রণয়ন করেছে। বিভিন্নমুখী পারদর্শিতা ব্যবহার করে খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিস্তুরে খাদ্য অধিদপ্তর নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করাসহ উত্তম খাদ্য উৎপাদন প্রণালি, খুচরা বিক্রেতা ও ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করবে। ভোক্তার প্রশিক্ষণ এবং খাদ্য ব্যবস্থাপনা দূষিত খাদ্যজনিত রোগ প্রতিরোধ করাসহ অন্যান্য বিষয়ে কাজ করবে।
নিরাপদ খাদ্য ক্রমবর্ধমানভাবে জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। বিশ্বব্যাপী সব সরকার নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে দূষিত খাদ্যজনিত রোগ বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের ক্রমবর্ধমান সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, সবজি উৎপাদন নিশ্চয়তা, বেশি ফলন ও পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষায় বেশির ভাগ সবজিতে কীট-নাশক প্রয়োগ করা হয়। কৃষি বিভাগের পরামর্শ ছাড়া ইচ্ছে মতো ব্যবহার করা হয়। যা ফসল ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।
গবেষণায় শাক-সবজিতে ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যাচ্ছে, যা কলেরা ও ডায়রিয়ার জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এরমধ্যে শশা ও কাঁচা মরিচ বিপজ্জনক। কারণ, এগুলো মানুষ খুব বেশি ধুয়ে খায় না। কাঁচা খায়। খাবারের উৎসগুলোতেই যখন খাবার নিরাপদ নয়, তখন সেটা ভয়াবহ।
নিরাপদ খাদ্য আইনের ১০ ধারায় বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি কীটনাশক, ছত্রাকনাশক, আগাছানাশক, মাকড়নাশক, কৃমিনাশক, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ (গুদামজাত খাদ্যদ্রব্যে ব্যবহৃত) এবং উদ্ভিদ বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রকের উপস্থিতি খাদ্যদ্রব্যে সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রার অতিরিক্ত বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হলে খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ, আমদানি, বিপণন বা বিক্রয় করতে পারবে না।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেগুন, ফুলকপি-বাধাকপি, শীমসহ মাটির উপরিভাগে উৎপাদিত ফসলে পোকা মাকড় বেশি আক্রমণ করে। এতে কীট-নাশক প্রয়োগও বেশি হয়। এছাড়াও উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজে ফলনের দ্রুত বৃদ্ধিতে কীট-নাশকের ব্যবহার বেশি হচ্ছে।
গবেষণায় দেখা যায়, ১৯ দশমিক ৭ ভাগ কৃষক রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমানোর পরামর্শ পেয়ে থাকেন। ৮০ দশমিক ৩ ভাগ কৃষকের কাছে এখনো রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমানোর পরামর্শ পাননি।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য-কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সৈয়দা সারওয়ার জাহান বলেন, কেমিক্যালযুক্ত সবজি বাজারজাত করা হলে ও খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করলে মানুষের শরীরে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে ; ধীরে ধীরে ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট জানায়, মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ১ শতাংশেরও কম, যেখানে ৩ থেকে ৫ শতাংশ থাকা দরকার। জৈব পদার্থের পরিমাণ কমে আসায় মাটির উর্বর শক্তি কমে যাচ্ছে। মাটিতে মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশক প্রয়োগ নিয়ন্ত্রণ করে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে রোগবালাই দমন প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াতে হবে।
সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে মাটির উর্বরতা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। স্বাধীনতার পরবর্তীতে দেশের খাদ্যশস্যের উৎপাদন, সবজির উৎপাদন সাড়ে ৩ গুণের বেশি বেড়েছে। এ সময়ের মধ্যে দেশের কৃষি ব্যবস্থা সার ও কীট-নাশকের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। সার-কীটনাশক ব্যবহারে স্বল্পমেয়াদে লাভবান ও খাদ্যশস্যে সফলতা এসেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মাটি ও পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। গত ৫২ বছরে মাটির উর্বরতা শক্তি প্রায় ৫১ শতাংশ কমেছে। যা আগামীর জন্য হতাশাজনক।
জেলা কৃষি-সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ-পরিচালক কৃষিবিদ গিয়াস উদ্দিন বলেন, আগে মারাত্মক কিছু কীট-নাশক ব্যবহার করা হত। যা ফসলের জন্য ক্ষতিকর। না বুঝেই এসব ব্যবহার করা হত। এখন সহনীয় পর্যায়ে এসেছে। জমিতে কীট-নাশক দেয়া যাবে, তবে মাত্রা পরিমাণ। কৃষক পরিমাণ মাত্রা না জেনে ব্যবহার করে থাকেন। এমনকি সকালে কীট-নাশক ব্যবহার করেই বিকেলে ফসল বিক্রি করেন। ক্ষেতে কীট-নাশক প্রয়োগের পর নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যেতে হবে। না হলে জমি ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।
দেখা গেছে, কৃষক জমিতে কীট-নাশক ব্যবহারে কোনো ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেন না। খেয়াল খুশি মতো ব্যবহার করেন। এতে ভোক্তা ও কৃষক উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হন।
চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ হাসিনা আকতার বলেন, কৃষক রাসায়নিক সার ব্যবহারের নিয়ম না জানায় উপর্যুপরি প্রয়োগ করেন। এতে রান্নার পরও বিষক্রিয়া নষ্ট হয় না। এই বিষক্রিয়া মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। যা মানুষের কিডনি, লিভারে সংক্রামণ ও ক্যান্সার সৃষ্টি আশঙ্কা রয়েছে।
এই পুষ্টিবিদ আরও বলেন, কৃষক হাতে গ্লাস, মুখে মাস্ক ও ব্যবহার নিয়ম না মেনেই কীট-নাশক ব্যবহার করে থাকেন। এতে কৃষকের চর্মরোগসহ নানা রকম রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন।

লেখক ঁ নিজস্ব প্রতিবেদক

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
The Post Viewed By: 199 People

সম্পর্কিত পোস্ট