চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

ফাস্ট ফুডের নামে কী খাচ্ছি?

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ

ফাস্ট ফুডের নামে কী খাচ্ছি?

পিঠা-পুলির চেয়ে এখন ফাস্ট ফুডের দিকে বেশি ঝোঁক তরুণ-তরুণীদের। বার্গার, পিৎজা, ফ্রায়েড চিকেন, ক্রাস্ট আরও কত কী। এয়াবিয়ান, চায়নিজ, পাকিস্তানি, থাই কতো দেশের কত খাবার। শুধু তরুণ-তরুণী নয়, ভোজনরসিকদের মধ্যেও ফাস্টফুডের কদর বাড়ছে। দল বেঁধে খেতে যায় হোটেল-রেস্তোরাঁয়। তাই দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে ওঠছে ফাস্ট ফুড। প্রশ্ন হচ্ছে, কতটুকু নিরাপদ এসব ফাস্ট ফুড।
একটু ফিরে যাই রোজার মাসে। এই মাসে সুস্বাদু ও বিশুদ্ধ খাবার খেতে চায় রোজাদাররা। দীর্ঘ লাইন ধরে কেনা হয় ইফতারসামগ্রী। কিন্তু কতটুকু নিরাপদ ছিল এসব খাদ্য। ফুটপাত থেকে শুরু করে নামী-দামী হোটেল-রেস্তোরাঁয় পাওয়া যায় ভেজাল ও নি¤œমানের খাদ্যসামগ্রী। জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও ভোক্তা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন অভিযানে তার প্রমাণ মিলেছিল।
অভিযানে দেখা গিয়েছিল, নামী-দামী হোটেল রেস্তোরাঁয় পচাবাসী ও ভেজালে খাবারে সয়লাব ছিল। কাপড়ের রং দিয়ে জিলাপি, বেগুনি ও পেঁয়াজু তৈরি ছাড়াও সব ধরনের খাবারে ছিল ক্ষতিকারক রঙের ব্যবহার। আর ফ্রিজে রাখা ছিল পচাবাসী খাবার। কয়েকটি অভিজাত রেস্তোরাঁয় পাওয়া গিয়েছিল পচাবাসী খাবার। যা হতবাক করেছিল ভোক্তাদের।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, প্রতিবছর প্রায় ৬০ কোটি মানুষ দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়। এ কারণে প্রতিবছর মারা যায় চার লাখ ৪২ হাজার মানুষ। এছাড়া, ৫ বছরের চেয়ে কম বয়সী শিশুদের ৪৩ শতাংশই খাবারজনিত রোগে আক্রান্ত হয়। এরমধ্যে প্রতিবছর প্রাণ হারায় ১ লাখ ২৫ হাজার শিশু।
চট্টগ্রামে কতটি ফাস্টফুড বা হোটেল-রেস্টুরেন্ট আছে তার কোন পরিসংখ্যান নেই। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন দোকান গড়ে উঠছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই বেশির ভাগ ফাস্ট ফুডের দোকান গড়ে উঠছে।
নিরাপদ খাদ্য আইনে ৭৫ রকমের খাদ্যের নমুনা পরীক্ষার কথা বলা আছে। এছাড়া হোটেল রেস্টেুরেন্টের কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে বাবুর্চিদের স্বাস্থ্য-পরীক্ষা করে স্বাস্থ্য-সনদ নেয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ হোটেল-রেস্টুরেন্টে তা মানা হচ্ছে না। অনেকেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে সনদ নেয়ার বিষয়টি জানেনও না।
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও কাট্টলী সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, কয়েকটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে পাওয়া গিয়েছিল ফ্রিজভর্তি রান্না করা বাসী মাছ-মাংস ও পচাবাসী খাবার। এসব খাবার গরম করে ক্রেতাদের কাছে পরিবেশন করা হতো। এসব কারণে জনস্বাস্থ্যহানি করা হচ্ছে। যা নিরাপদ খাদ্য আইনের পরিপন্থী।
রমজান মাসে জোরালো অভিযান পরিচালিত হয় হোটেল রেস্তোরাঁগুলো। বছরের অন্যান্য সময়ে সেই রকম অভিযান পরিচারিত হয় না। তারপরও কালেভদ্রে পরিচালিত ভেজালবিরোধী অভিযানে ফাস্ট ফুডের দোকানের খাবারে কাপড়ের রং মেশানো, পচাবাসী খাবারের উপস্থিতি পাওয়া যায়। ফাস্ট ফুডের দোকানে এভাবে নি¤œমানের খাবার পাওয়া গেলে ভোক্তারা কোথায় ভরসা রাখবে ?
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্যানিটারি ইন্সপেক্টররা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছয় হাজার ৩৬০টি খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করেন। মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (আইপিএস) ফুড টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে তা পরীক্ষা করানো হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এক হাজার ৯৭৮টি নমুনায় অর্থাৎ ৩১ দশমিক ১০ শতাংশ খাদ্যপণ্যে ভেজাল পাওয়া যায়।
মানুষের বেঁচে থাকা এবং সুস্থ থাকার জন্য নিরাপদ খাবার অতি গুরুত্বপূর্ণ। অতি মুনাফা লাভের মালিক-কর্মচারীরা মানহীন ও ক্ষতিকর খাবার সরবরাহ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য আইন প্রয়োগে বিভিন্ন সংস্থার জনবল সংকটের কথাও উঠে আসছে বারবার। তাই ভোগ্যপণ্য আমদানি বা উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে খাবার পর্যন্ত মান যাচাই করা অপরিহার্য। নিরাপদ খাবার পেতে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
চসিকের মনিটরিং : সিটি কর্পোরেশনে নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর অনুমোদিত পরিদর্শক আছেন মাত্র একজন। অন্য বিভাগ থেকে ১২ জনকে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হলেও তাদের আইন প্রয়োগের ক্ষমতা নেই। অথচ নগরীতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন খাবারের দোকান।
চসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেলিম আকতার চৌধুরী পূর্বকোণকে জানান, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ১৯৮৮ সালের নিয়োগ বিধির অনুমোদন না হওয়ার কারণে দীর্ঘ দিন ধরে স্যানিটারি ইন্সপেক্টর নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ১৩ জন পরিদর্শক অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। লোকবলের অভাবে এই খাতে আশানুরূপ সাফল্য আসছে না।
সরকার খাদ্যমানের বিবেচনায় হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোকে শ্রেণিবিন্যাস করে দিয়েছে। চট্টগ্রামে না হলেও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে করা হয়েছে। তারপরও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। নামীদামী হোটেল-রেস্তোরাঁ বা ফাস্ট ফুডের দোকানে অস্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি করা হচ্ছে। আর রাস্তার পাশের হোটেল-রেস্তোরাঁর অবস্থা কী, তা সহজেই অনুমেয়।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ঢাকার হোটেল-রেস্টুরেন্ট মালিকদের সঙ্গে সভা করে নিরাপদ খাদ্য পরিবেশনের বিষয়ে দিক-নির্দেশনা দিয়েছে। যেমন : খোলা খাবার না রাখা, পোড়া তেল ও রং ব্যবহার না করা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার পৃথকভাবে ফ্রিজে সংরক্ষণ, ফ্রিজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে খাবার সংরক্ষণ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা ও অসুস্থ কর্মচারীর মাধ্যমে খাবার তৈরি না করা। নির্দেশনার বিষয়ে গাইড লাইন তৈরি হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিকদের দেওয়া হয়েছে। মনিটরিং করা হচ্ছে। কিন্তু চট্টগ্রামে এখনো সেই ধরনের পদক্ষেপ উপেক্ষিত রয়েছে।

লেখক ঁ নিজস্ব প্রতিবেদক

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
The Post Viewed By: 144 People

সম্পর্কিত পোস্ট