চট্টগ্রাম বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

কীটনাশক বিষাক্ত হচ্ছে পানি

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৩:৫৪ পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ আলী

কীটনাশক বিষাক্ত হচ্ছে পানি

চট্টগ্রামের প্রকৃতিতে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারে বিষ বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে নদ-নদী, পুকুর, দিঘি ও ডোবাসহ বিভিন্ন জলাশয়ের সাথে মিশে পানিকে বিষাক্ত করে। নদী, সমুদ্র ও সার্বিকভাবে পানির সাথে সংশ্লিষ্ট জীব-বৈচিত্রের জন্য কীটনাশকের ব্যবহার নীরব হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিষাক্ততা খাদ্য শৃঙ্খলে মিশে যাচ্ছে।
ফসলের রোগ, কীট ও আগাছা দমনের জন্য ব্যবহৃত রাসায়নিক দ্রব্যকে কৃষি বিভাগের ভাষায় পেস্টিসাইড বা কীটনাশক বলে। পেস্টিসাইড ব্যবহার সহনীয় রাখতে সরকারের যে উদ্যোগ রয়েছে তা কোনো কাজে আসছে না। একদিকে পেস্টিসাইড ব্যবহারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে, আবার একই বিভাগে নতুন নতুন পেস্টিসাইড আমদানি করতে কোম্পানিগুলোকে লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে। কোম্পানিগুলো নিজেদের আমদানি করা কীটনাশক বিক্রির জন্য প্রকাশে-অপ্রকাশ্যে কৃষকদের উৎসাহিত করছে। ফলে কৃষি বিভাগের উদ্যোগ অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পৃথিবীতে প্রতি মিনিটে দুই থেকে তিনজন মানুষ বিভিন্ন ধরনের কীটনাশকের মাধ্যমে আক্রান্ত হচ্ছে। মূলত কৃষি কাজে নিয়োজিত ও সরাসরি মাঠে কাজ করা কৃষকরাই কীটনাশকের ভয়াবহতার শিকার। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীজুড়ে লাখ লাখ মানুষ কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব দ্বারা আক্রান্ত।
পরিবেশ এবং মানুষের শরীরে জন্য মারাত্মক বিভিন্ন কীটনাশকের বিষাক্ততা সম্পর্কে বিশদ জানার পর পুরো পৃথিবীতে এগুলো নিষিদ্ধ করে দেওয়া হলেও বাংলাদেশসহ আরও কিছু উন্নয়নশীল দেশে ক্ষতিকর কীটনাশকগুলো আশঙ্কাজনক হারে ব্যবহৃত হচ্ছে।
কৃষির সাথে সংশ্লিষ্টরা জানায়, দেশে খাদ্যচাহিদা পূরণ করতে বিভিন্ন জাতের উচ্চ ফলনশীল ফসলের চাষাবাদের ওপর জোর দেয়া হয় কয়েক যুগ পূর্বে। এই চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত হয় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক। কিন্তু জমির গুণগত মান বুঝে কি পরিমাণ কীটনাশক ও রাসায়নিক সার দিতে হবেÑ তা বেশিরভাগ কৃষকই যথাযথভাবে জানে না।
একটি বেসরকারি সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রয়োজনের তুলনায় ছয়গুণের অধিক কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়। ১৯৫৪ সালের তুলনায় ২০১০ সালে দেশে কীটনাশকের ব্যবহারও বৃদ্ধি পেয়েছে ৬ গুণেরও বেশি। বর্তমানে বৃদ্ধির সংখ্যা আরো বেশি।
কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারে কী কী ক্ষতি হয়, তা নিয়ে বহু গবেষণা-প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে, হচ্ছে। কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে জীবকুল, উদ্ভিদ এবং মূল্যবান মৎস্য সম্পদের। বিষাচ্ছাদিত পরিবেশের কারণে বিভিন্ন জাতের মৎস্যর প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে। ফলে প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদের তালিকাও দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। কৃষি সহায়ক পাখি ও কীট পতঙ্গ হারিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, নারী ও শিশুস্বাস্থ্যের ঝুঁকির বৃদ্ধি ঘটছে। কারণ তারাই কীটনাশক মিশ্রণ ও সংরক্ষণের প্রধান কাজগুলো করে থাকে। খুব বেশি কীটনাশকের কাছে থাকলে একজন নারীর সন্তানধারণ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। একই সাথে মাটির ক্ষতি হয় আরো বেশি। দেশের কোনো মাটির ক্ষারত্ব কম, অমøত্ব বেশি, আবার কোনো মাটির বিপরীত অবস্থা। কোথাও ফসফেট বা পটাশের মাত্রা কম। জৈব কার্বনের মাত্রাও আশঙ্কাজনক হারে কমছে। এসব বিবেচনায় না রেখে নির্বিচারে ব্যবহার হচ্ছে কীটনাশক। তাতে সঙ্কটে পড়েছে রাসায়নিককে খাদ্যে রূপান্তরিত করে মাটিতে লুকিয়ে থাকা ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া। তারাই ইউরিয়া, পটাশ, ফসফেটকে গাছের উপযোগী করে। ওইসব ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া যত কমবে ততই রাসায়নিক সারের কার্যকারিতা ও উৎপাদন হ্রাস পাবে।
অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, ‘কীটনাশক রাসায়নিক উপাদানসমূহ অত্যন্ত কর্মক্ষম ও দ্রুত ক্রিয়াশীল। এগুলো একদিকে বিস্তীর্ণ এলাকায় রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখে, অন্যদিকে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্টেরও কারণ হয়। সাধারণত ব্যবহৃত কীটনাশকের এক তৃতীয়াংশ পোকামাকড় নিধনে ভূমিকা রাখে। অবশিষ্ট দুই-তৃতীয়াংশ অজ্ঞতার কারণে পরিবেশকে নষ্ট করে ফেলে। তৃতীয় বিশ্বে কীটনাশকের অপব্যবহার, অতিরিক্ত ব্যবহার, সতর্কহীন ব্যবহারই হচ্ছে বেশি। এগ্রো কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত প্রচারণা ও বিপণন কৌশল বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কীটনাশকের অপব্যবহারের কারণে পানি, বায়ু, মাটিদূষণে দেশের কোটি কোটি মানুষ ইতোমধ্যে খাদ্যচক্রে বিষক্রিয়ার শিকার। অপরীক্ষিত উচ্চমাত্রার রাসায়নিক বিষ ফসলি জমিতে ব্যবহারের ফলে অল্পদিনের মধ্যে মাটির ঊর্বরশক্তি যেমন নষ্ট হচ্ছে, একইভাবে কীটনাশক বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে নদ-নদী ও জলাশয়ের পানির গুণাগুণ নষ্ট করে দিচ্ছে। এতে জলজ বাস্তুতন্ত্রের মূল উপাদান জুপ্ল্যাঙ্কটনের মৃত্যুর কারণে ইতোমধ্যেই দেশি প্রজাতির মাছ ও পোকামাকড়ের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপ পরিচালক কৃষিবিদ মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দীন বলেন, “ফসলে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে পানি দূষিত হয়ে মাটির অনুজীব মারা যাচ্ছে। একই সাথে ফসলের উপকারী পোকা-মাকড় মারা পড়ছে। তাতে ক্ষতি হচ্ছে খাদ্যচক্রের। মূলত কীটনাশক ব্যবহার হয় খারাপ পোকা মারার জন্য। কিন্তু খারাপ পোকা মারতে গিয়ে মারা যাচ্ছে ভাল পোকা যা ফসলের জন্য অত্যন্ত উপকারী। কীটনাশক ব্যবহার যুক্তিক নয়, যে পরিমাণ ব্যবহারের নিয়ম রয়েছে, তারচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে। এতে নষ্ট হচ্ছে প্রতিবেশের ইকো সিস্টেমে ভারসাম্য। কমে যাচ্ছে মাটির উৎপাদনশীলতাও। সেই সাথে ফসলের উৎপাদন কম হচ্ছে। পানি দূষিত হওয়ার কারণে মাৎস্যজাতীয় প্রাণির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কীটনাশক ছাড়াও ফসলে ফার্টিলাইজার ব্যবহারের কারণে পানি দূষিত হয়। এতে পানির পিএইচ নষ্ট ও অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাচ্ছে।”

লেখক ঁ নিজস্ব প্রতিবেদক

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 289 People

সম্পর্কিত পোস্ট