চট্টগ্রাম বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

আর্সেনিক ঝুঁকিতে মিরসরাই ও সীতাকু-

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৩:৪২ পূর্বাহ্ণ

এনায়েত হোসেন মিঠু ও সৌমিত্র চক্রবর্তী

আর্সেনিক ঝুঁকিতে মিরসরাই ও সীতাকু-

চট্টগ্রামে আর্সেনিক ঝুঁকিতে মিরসরাই ও সীতাকু- উপজেলা। মিরসরাইয়ে ৫০ ভাগ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক রয়েছে। এতে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে এক লাখ পরিবার।
মিরসরাই : মিরসরাই উপজেলার এক লাখ পরিবার চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। উপজেলার ভূগর্ভের পানিতে মাত্রারিক্ত আর্সেনিক থাকায় এ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অথচ সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এমন ভয়াবহতা থেকে মানুষকে রক্ষা করতে কোন ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসের তথ্যমতে, ১৬ বছর আগে অর্থাৎ ২০০২-২০০৩ সালের নাগাদ এখানকার গ্রামে গ্রামে নলকূপগুলোর পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা নিরূপণ করা হয় এবং একই সময় আর্সেনিকযুক্ত পানি পানের কারণে আর্সেনিকোসিস রোগে আক্রান্ত ৪০ জন রোগী শনাক্ত করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে বর্তমানে উপজেলার ৫০ ভাগ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক রয়েছে।
২০০৩ সালের পর থেকে এখানকার নলকূপগুলোর পানি পরীক্ষা এবং আর্সেনিক রোগে আক্রান্ত রোগী শনাক্তের কোন পদক্ষেপ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে গত এক যুগের বেশি সময় ধরে আর্সেনিকোসিস রোগে আক্রান্ত রোগীর কোন পরিসংখ্যান নেই উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসে। শুধু তাই নয়, এ প্রসঙ্গে মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেননি।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসের দেয়া তথ্য মতে, ২০০২-০৩ অর্থ বছরে উপজেলার ৭৫ হাজার ৩৬৬ পরিবারের ৩২ হাজার ৪৮০টি নলকূপের পানিতে আর্সেনিক পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষার আওতায় আসা নলকূপের পানিতে গড়ে ৩৯ দশমিক ৭৭ মাত্রায় আর্সেনিক থাকার বিষয়টি প্রমাণ মেলে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৮৩৩টি নলকূপের প্রতি লিটার পানিতে দশমিক ০৫ মিলিগ্রামের অধিক মাত্রায় আর্সেনিকের শনাক্ত করে নলকূপগুলোর পানি পান না করতে লাল রং দিয়ে চিহ্নিত করা হয়।
২০০২-০৩ সালে চালানো পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী, মিরসরাই পৌরসভায় শতকরা ৬৬ দশমিক ৮৩ ভাগ, খইয়াছড়ায় ইউনিয়নে ৬৬.২৯ ভাগ, মায়ানী ইউনিয়নে ৫৬.১১ ভাগ, মিরসরাই সদর ইউনিয়নে ৬০ দশমিক ৯৬ ভাগ, ওয়াহেদপুর ইউনিয়নে ৫১ দশমিক ৭৯ ভাগ, ওচমানপুর ইউনিয়নে ৫১ দশমিক ২০ ভাগ, ধুম ইউনিয়নে ৫১ দশমিক ০৯ ভাগ, কাটাছরা ইউনিয়নে ৪৭ দশমিক ৬৬ ভাগ, হাইতকান্দি ইউনিয়নে ৪৫ দশমিক ৩৩ ভাগ, দূর্গাপুর ইউনিয়নে ৪৪ দশমিক ০৫ ভাগ, মঘাদিয়া ইউনিয়নে ৪০ দশমিক৩৪ ভাগ, মিঠানালা ইউনিয়নে ৩৯ দশমিক ৮৫ ভাগ, ইছাখালী ইউনিয়নে ৩৯ দশমিক ১৭ ভাগ ও সাহেরখালী ইউনিয়নে ৩০ দশমিক ৩৬ ভাগ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক শনাক্ত করা হয়।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ সহকারি প্রকৌশলী কে.এম সাঈদ মাহমুদের মতে, মিরসরাইয়ে আর্সেনিক থেকে মুক্তি পেতে এক লাখ পরিবারের প্রতি ১০ পরিবারের জন্য ১টি করে গভীর নলকূপ স্থাপন করা খুব জরুরি। অথচ সেই হিসেবে উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার গভীর নলকূপ স্থাপন করা প্রয়োজন। কিন্তু ২০০৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গত ১৪ বছরে পুরো উপজেলায় মাত্র ৪৪১টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে।
২০০২-০৩ সালে সরকারিভাবে আর্সেনিকের ওপর জরিপ চালানোর আগে ২০০১ সালে মিরসরাইয়ে নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা নিরূপণ করতে জরিপ চালায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রশিকা। ওই সময় উপজেলার অধিকাংশ নলকূপের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক শনাক্ত হলে সুদমুক্ত ঋণে মিরসরাই সদর ও উপকূলীয় ইছাখালী ইউনিয়নে চার লাখ টাকা ব্যয়ে পৃথক দুইটি বিশুদ্ধ পানির প্ল্যান্ট স্থাপন করে। ওই প্ল্যান্টগুলো থেকে প্রতি কলসি পানি ৩ টাকা দামে সরবরাহ করা হতো।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মিরসরাই সদরের প্ল্যান্টটি দিয়ে ৭০-৮০ পরিবারের বিশুদ্ধ পানির চাহিদা মিটলেও মোট জনসংখ্যার তুলনায় তা ছিল অপ্রতুল। বর্তমানে আর্থিক ও ব্যবস্থাপনা সংকটে সেটিও বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে। ইছাখালী ইউনিয়নের প্ল্য্যন্টটির বিশুদ্ধ পানি ওই এলাকার জনগণ অর্থের বিনিময়ে কিনে পান না করায় প্ল্যান্ট মালিক লোকসান গুণে সেটি বন্ধ করে দেয়।
প্ল্যান্ট মালিক আবুল কালাম আজাদ জানান, এলাকার মানুষ আর্সেনিক যুক্ত পানি পান করলেও অর্থ দিয়ে আর্সেনিক মুক্ত পানি পান করতে চাইছে না। ফলে প্রশিকার এক লাখ ১৯ হাজার টাকা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ২০০৯ সারে প্ল্যান্টটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রশিকার মিরসরাই অফিসের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়ায় এ বিষয়ে সংস্থাটির কোন কর্মকর্তার বক্তব্য নেয়া যায়নি।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার অধিকাংশ এলাকার নলকূপের পানিতে আর্সেনিক বিষ থাকলেও এখন কোথাও কোন নলকূপে আর্সেনিক শনাক্তকরণ লাল রঙের চিহ্ন নেই। ২০০১ সালে প্রশিকা নলকূপের পানি পরীক্ষার মাধ্যমে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকযুক্ত নলকূপগুলোতে লাল চিহ্ন দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করলেও সে চিহ্নগুলো এখন মুছে গেছে। ফলে উপজেলার হাজার হাজার মানুষ এখন ওই নলকূপ গুলোর আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে।
এদিকে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকযুক্ত পানি পানে মানুষ কী ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে জানতে চাইলে মাতৃকা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. জামসেদ আলম বলেন, “আর্সেনিক বিষ মানবদেহে পচন রোগ, কিডনির সমস্যা, ক্যান্সার, হাত পায়ের তালুতে চর্মরোগের সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন এবং এ রোগ থেকে মুক্তির জন্য উপজেলাজুড়ে পর্যাপ্ত গভীর নলকূপ স্থাপন খুবই জরুরি।”
অবশ্য মিরসরাই উপজেলা এলাকায় আর্সেনিকের ভয়াবহতার কথা জানিয়ে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী কে.এম সাঈদ মাহমুদ জানান, “মিরসরাই উপজেলা আর্সেনিকের মারাত্মক ভয়াবহতার মধ্যে রয়েছে। উপজেলার প্রায় এক লাখের বেশি পরিবারের অধিকাংশ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক রয়েছে। এতে আর্সেনিকোসিস রোগের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।”
এ থেকে পরিত্রাণ পেতে কোন ধরনের প্রদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন জানতে চাইলে সাঈদ মাহমুদ বলেন, ‘আর্সেনিকোসিস থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন গভীর নলকূপ স্থাপন ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহার। কিন্তু এর কোন ব্যবস্থাই মিরসরাইতে নেই। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যয়বহুল হওয়ায় এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না উপজেলাবাসী। সরকারিভাবে গভীর নলকূপ স্থাপন করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম। সরকারি বরাদ্দ না থাকায় নলকূপের পানি পরীক্ষা ও রোগী শনাক্তকরণ কাজ বেশ কয়েক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে।’
সীতাকু- : সীতাকু-ে পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা অনেক বেশি। সবচেয়ে বেশি আর্সেনিক পৌরসভা এলাকায়। তবে বিকল্প পানি ব্যবহার ও সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে এখন আর্সেনিক আক্রান্ত রোগি একেবারেই দুর্লভ বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। অন্যদিকে স্থানীয় এনজিও কর্মীরা বলছেন এখনো আর্সেনিক আক্রান্ত রোগী আছে। তবে তারা জটিল অবস্থার নয় বলেই তদারকি হয় না।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সীতাকু- উপজেলা খুবই আর্সেনিক প্রবণ এলাকা। এই উপজেলার সর্বত্র টিউবয়েলে আর্সেনিক আছে। তবে সবচেয়ে বেশি আর্সেনিক পাওয়া যায় পৌরসভা এলাকাতে। পৌরসদরের অধিকাংশ টিউবয়েলের পানিই ব্যবহারের অনুপোযোগী। তবে সবচেয়ে বেশি আর্সেনিক রয়েছে আমিরাবাদ গ্রামে।
ফলে এলাকাবাসী এখন ডিপটিউবয়েল, মিনারেল ওয়াটার কিংবা ফিল্টারের মাধ্যমে পানি শোধন করে পান করছেন। এতে আর্সেনিক আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা কমেছে। সেসব তথ্যের সত্যতা মেলে পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ড আমিরাবাদ গ্রামের বাসিন্দা এনজিও কর্মী সঞ্জয় চৌধুরীর কথায়।
তিনি বলেন, আমার এলাকাতেও টিউবয়েলে আর্সেনিক আছে। তবে আমি গভীর নলকূপের পানি পান করি এবং সাপ্লাইয়ের পানি ব্যবহার করি। ফলে আমাকে আর্সেনিকের ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে না। তার মত ওই এলাকার অধিকাংশ মানুষ এখন নিরাপদ পানি পান করছেন বলে জানান তিনি।
পৌরসদরের মধ্যম মহাদেবপুর গ্রামের টিউবয়েলেও আর্সেনিকের মাত্রা বেশি। পৌরসদরের ৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর দিদারুল আলম এপেলো
বলেন পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি হলেও এখন আর কেউ আর্সেনিকযুক্ত পানি ব্যবহার করছে না। তাই আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীও নেই। তিনি বলেন আমি পৌরসভার ৩, ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের কথা জানি। এসব এলাকায় কোন আর্সেনিক আক্রান্ত রোগী নেই।
এদিকে এলাকাবাসীর মতই সীতাকু-ে কোন আর্সেনিক আক্রান্ত রোগী নেই বলে জানালেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নুর উদ্দিন রাশেদ বলেন, এখানে আর্সেনিক আক্রান্ত রোগী পাইনি। যদি এই রোগের প্রকোপ থাকত তাহলে অবশ্যই বিষয়টি আমার নজরে থাকত।
সীতাকু- উপজেলা জনস্বাস্থ্য ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. রাশেদুজ্জামান বলেন, আমরা আর্সেনিক সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে কাজ করি। এখানে পানিতে সর্বত্র কমবেশি আর্সেনিক আছে। তবে উপজেলার সবচেয়ে বেশি আর্সেনিক হলো পৌরসভা এলাকায়। এখানে শতভাগ টিউবয়েল অকার্যকর। তাই গভীর নলকূপের ওপরই নির্ভর করছেন এলাকাবাসী। এছাড়া মানুষ এখন সচেতন হয়েছে। তাই তারা পরিশুদ্ধ পানি, ফিল্টারের পানি, গভীর নলকূপের পানি ব্যবহার করছেন। এ কারণে এখন আর্সেনিক জনিত রোগ নেই বললেই চলে।
এদিকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, হাসপাতাল ও জনপ্রতিনিধিরা আর্সেনিক আক্রান্ত রোগি নেই বললেও একসময় এই এলাকায় আর্সেনিক নিয়ে কাজ করা এনজিও সংস্থা ইপসার তৎকালীন ওয়াটার সাপ্লাই এন্ড স্যানিটেশন প্রজেক্ট এর কো-অর্ডিনেটর বর্তমানে ইপসার উপজেলা ম্যানেজার মো. শাহা সুলতান শামীম বলেন, সীতাকু-ে আর্সেনিক নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি এখানে সবচেয়ে বেশি আর্সেনিক আছে পৌরসভায়। তার মধ্যে বেশি আমিরাবাদ এলাকায়। এখানে অনেকেই আর্সেনিক আক্রান্ত ছিলো। তিনি বলেন, আমি মনে করি রোগীর সংখ্যা কমলেও এখনো কিছু কিছু আছে। কিন্তু এখন রোগীর সংখ্যা কম হওয়ায় কেউ তেমন খবর রাখেন না। খোঁজ করলে দুয়েকজন পাওয়াও যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

লেখক ঁ সীতাকু- সংবাদদাতা

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 173 People

সম্পর্কিত পোস্ট