চট্টগ্রাম বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

দূষণ-রোধে ওয়াসার স্যুায়ারেজ প্রকল্প

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৩:৪২ পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম

সেপটিক ট্যাংকসহ নানা বর্জ্যে ভয়াবহ দূষণ

দূষণ-রোধে ওয়াসার স্যুায়ারেজ প্রকল্প

প্রায় সাড়ে তিনশত বছর পূর্বে কর্ণফুলী নদীর তীরে চট্টগ্রাম শহরের গোড়াপত্তন। চট্টগ্রাম ওয়াসা গঠনের পূর্বে এ শহরে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল ও চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালিটি ২৫টি নলকূপের সাহায্যে দৈনিক প্রায় দুই কোটি লিটার পানি সরবরাহ করতো। নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নির্মাণ, পরিচালন ও সংরক্ষণ ওয়াসার উদ্দেশ্য হওয়া সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠালগ্ন অর্থাৎ ১৯৬৩ সাল থেকে এ যাবত চট্টগ্রাম ওয়াসার কার্যক্রম প্রধানত সুপেয় ও নিরাপদ পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ ছিল। দীর্ঘ ৫৬ বছর পর স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নগরবাসী যাতে উন্নত ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবন ধারণ করতে পারে সেজন্য সরকার নগরীতে প্রথমবারের মত পয়ঃনিষ্কাশন সেবাও চালু করতে যাচ্ছে।
পয়ঃনিষ্কাশন সেবা কি : সহজবোধ্য ভাষায় বলতে গেলে নগরবাসীর বসতবাড়ি হতে বৃষ্টির পানি ছাড়াও আরো দুই ধরনের তরল বর্জ্য নিঃসৃত হচ্ছে। এ দুই ধরনের তরল বর্জ্য হলো বাসাবাড়ির রান্নাঘর ও গোসলখানা হতে নিঃসৃত পানি এবং টয়লেটের সেপটিক ট্যাংক হতে নির্গত পানি (ওভারফ্লো)। নগরীর এ ধরনের পানি প্রতিদিন সরাসরি রাস্তার পাশে নালায় পড়ছে। সেখান বিভিন্ন খাল হয়ে সুপেয় পানির আধার কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে পড়ছে। এ অবস্থা উত্তরণে চট্টগ্রাম ওয়াসা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বলতে নিঃসৃত এ দুই ধরনের তরল বর্জ্য নালায় প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করা। একই সাথে নালার পরিবর্তে তরল বর্জ্য রাস্তায় স্থাপিত পাইপের মাধ্যমে সরাসরি পরিশোধন প্ল্যান্টে পাঠিয়ে দেয়া। এরপর পরিশোধন প্ল্যান্টে যথাযথভাবে পরিশোধনের পর তা আবার পরিবেশে ছেড়ে দেয়া। এ ব্যবস্থায় যুক্ত বসতবাড়িতে আর কোন সেপটিক ট্যাংক ব্যবহার কিংবা নির্মাণের প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র বাড়ির ছাদ হতে নির্গত বৃষ্টির পানি রেইন ওয়াটার পাইপের মাধ্যমে সরাসরি রাস্তার পাশে নালায় প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ থাকবে। এক কথায় বৃষ্টির পানি ব্যতিত বাসাবাড়ির নিঃসৃত সকল তরল বর্জ্য পাইপ সংযোগের মাধ্যমে পরিশোধন প্ল্যান্টে নিয়ে পরিশোধন করা হলো পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা।
পয়ঃনিষ্কাশন সেবা কেন প্রয়োজন : কর্ণফুলী ও হালদা নদীকে ঘিরে চট্টগ্রাম শহর গড়ে উঠেছে। এ দুটি নদী চট্টগ্রাম মহানগরীর সুপেয় পানির প্রধান উৎস। নগরীর অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সুপেয় পানি সরবরাহে এ দুটি নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু বসতবাড়ির নিঃসৃত এ দু’ধরনের তরল-বর্জ্য রাস্তার পাশে নালার মাধ্যমে খাল হয়ে কর্ণফুলী ও হালদা নদী এবং বঙ্গোপসাগরে পতিত হচ্ছে যা সহনীয় পরিবেশের জন্য উদ্বেগের কারণ। তাই এ দুটি নদীর দূষণ হতে রক্ষা করতে হবে। নগরীতে বর্তমানে পানি সরবরাহ সন্তোষজনক হলেও নগরীর কোন অংশই প্রকৃতপক্ষে কোন প্রকার পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত নয়। নগরীর অধিকাংশ (প্রায় ৮৮%) বসতবাড়ি মূলত অনসাইট স্যানিটেশন ব্যবস্থার (স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ও সেপ্টিক ট্যাংক) সাথে যুক্ত। ফলে অধিকাংশ জনসংখ্যা প্রতীকস্বরূপ সেপটিক ট্যাংক ও পোর-ফ্লাশ স্যানিটেশন ব্যবস্থা (অন-সাইট) ব্যবহার করে। নগরীতে নিয়মিত পয়ঃবর্জ্য সংগ্রহের কোন প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা না থাকায় বিভিন্ন উৎস হতে নিঃসৃত পয়ঃবর্জ্য মূলত রাস্তার পাশের নালায় নিপতিত হওয়া ছাড়া কোন বিকল্প নেই। পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনের সামান্যতম কোন ব্যবস্থাই নেই। এতে খাল বিল ভরাট হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। নগরীর বেশিভাগ বর্জ্য সুপেয় পানির উৎস কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে গিয়ে পড়ছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ২৮৮ মিলিয়ন লিটার বর্জ্য নিঃসৃত হচ্ছে। যা আগামী ২০৩০ সালের দিকে প্রতিদিন ৫১৫ মিলিয়ন লিটার হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এছাড়াও নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৫৩৯ ঘনমিটার ফিক্যাল স্লাজ সেপটিক ট্যাংকে জমা হচ্ছে যা আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতিদিন প্রায় ৭১৫ ঘনমিটার হবে। ফলে নদীর পানি প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে। তাতে সার্বিকভাবে দূষণ করছে চট্টগ্রামের পরিবেশ। এ অবস্থায় ভবিষ্যতে নগরীর সুপেয় পানি সরবরাহে সংকট সৃষ্টির হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
নগরীর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা প্রবর্তনে চট্টগ্রাম ওয়াসা’র উদ্যোগ : চট্টগ্রাম শহরে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সূচনা এবং ক্রমান্বয়ে শহরের সকল জনগণকে আধুনিক পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থার আওতায় আনার জন্য পুরো শহরে পরিকল্পিত স্যানিটেশন ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করেছে ওয়াসা। এতে আগামী ৩০ বছরের মধ্যে ওয়েস্ট ওয়াটার সংগ্রহ ও পরিশোধন অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ চিহ্নিত করা হয়েছে যা পর্যায়ক্রমে চট্টগ্রাম ওয়াসা বাস্তবায়ন করবে। চট্টগ্রাম শহরকে পয়ঃব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্যে ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম ওয়াসা একটি মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করে। মাস্টার প্ল্যানে পুরো শহরকে ৬টি ক্যাচমেন্ট এলাকায় ভাগ করে প্রতি জোনের জন্য ১টি পয়ঃশোধনাগার (এসটিপি) নির্মাণ এবং পুরো শহরের জন্য ২টি ফিক্যাল স্লাজ শোধনাগার স্থাপনের সুপারিশ করা হয়। মাস্টার প্ল্যানের সুপারিশ অনুসারে চট্টগ্রাম ওয়াসার ১০০% পরিবেশবান্ধব স্যানিটেশন ব্যবস্থা উদ্যোগের অংশ হিসাবে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ৩ হাজার ৮০৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘নগরীর পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা স্থাপন প্রকল্প (প্রথম পর্যায়)’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় আনুষঙ্গিক পয়ঃলাইন নির্মাণসহ স্যানিটেশন সুবিধাদিসমূহ তৈরি করা হবে।
প্রকল্পের প্রধান প্রধান কার্যক্রম : পয়ঃশোধনাগার নির্মাণ (১ লক্ষ ঘন মি./দিন) ১টি, পয়ঃপাইপ লাইন নির্মাণ (প্রায় ২০০ কিলোমিটার), পাম্প স্টেশন (১৫টি), বাড়ির সংযোগ (৭২ হাজার ৫০২টি) ও সার্ভিস লাইন (১৪৪ কিলোমিটার), ফিক্যাল স্লাজ শোধনাগার (৩০০ ঘন মি./দিন) (১টি), অনসাইট স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও ফিক্যাল স্লাজ সংগ্রহ ও পরিবহন সরঞ্জাম।
এটি নগরীর পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা স্থাপনে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রতিফলন। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের সুফল হিসেবে প্রায় ২০ লক্ষ জনগণকে উন্নত পয়ঃব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হবে। আাগামী ২০২৩ সাল নাগাদ শতকরা ১৯ ভাগ জনগোষ্ঠীকে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হবে এবং অবশিষ্ট জনগোষ্ঠীর শতকরা ৪১ ভাগ নিরাপদ সেপটিক স্লাজ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা সম্ভব হবে। এ প্রকল্পের আওতায় হালিশহর কেচমেন্ট এলাকার জন্য পয়ঃশোধনাগার নির্মাণ, ফিকেল স্লাজ ম্যানেজম্যান্ট অবকাঠামো নির্মাণ এবং পয়ঃলাইন নির্মাণ করা হবে। এ সকল স্যানিটেশন অবকাঠামোর নকশা ও নির্মাণ তদারকিকরণ সেবার জন্য মালয়েশিয়া ভিত্তিক কারিগরি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মালয়েশিয়ার জেবি অব ইরিঙ্কো এসডিএন. বিএইচডি-কে চট্টগ্রাম ওয়াসা নিয়োগ প্রদান করেছে।
পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থাপনে বৈশি^ক চ্যালেঞ্জ ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট : পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থাপন সব সময়ের জন্য একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ কাজ। একই সাথে এ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ এখনো অনুৎসাহিত রয়েছে। বিশে^ এটিকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ কারণে প্রতিবছর বিশে^ পয়ঃনিষ্কাশন কভারেজ ১% এর কম হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই নতুন একটি ধারণা এখন বিশে^ প্রচলিত। তা হলোÑ নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থা। অর্থাৎ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থাপনের পাশাপাশি নিরাপদ উপায়ে সেপটিক স্লাজ ব্যবস্থাপনাও সমধিক গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা। বর্তমানে বিশে^র মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ জনগোষ্ঠী নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় রয়েছে। জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৫% এখনো উম্মুক্ত স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করে যার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় ৩৬%, পাশর্^বর্তী দেশ ভারতে প্রায় ৪৫% এবং বাংলাদেশে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি রয়েছে। এসডিজি ৬.২ এর লক্ষ্য অর্জনে সরকার বদ্ধ পরিকর এবং সে লক্ষ্যে চট্টগ্রাম ওয়াসা কাজ করে যাচ্ছে। নগরীতে কোন প্রতিষ্ঠিত ফিক্যাল স্লাজ ব্যবস্থাপনা না থাকায় বসতবাড়ির সেপটিক স্লাজ সুইপারদের মাধ্যমে খালি করা হলেও তা নিকটবর্তী নালা ও খালে ফেলে দেয়া হচ্ছে। ফলে একটি ৫ ঘনমিটার সেপটিক ট্যাংকের বর্জ্য প্রায় ১০ হাজার লোকের উম্মুক্ত স্থানে মলমূত্র ত্যাগের সমতুল্য। যা ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ করছে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। অবশ্য বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন চট্টগ্রাম শহরের অবস্থান হওয়ায় নদী দূষণের ওপর প্রতিদিন জোয়ার-ভাটার প্রভাব আর্শীবাদ স্বরূপ।

লেখক ঁ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, চট্টগ্রাম ওয়াসা

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 184 People

সম্পর্কিত পোস্ট