চট্টগ্রাম সোমবার, ২৫ মে, ২০২০

সর্বশেষ:

বিপন্ন চট্টগ্রাম বিশুদ্ধতায় উত্তরণ

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৬:৪৫ পূর্বাহ্ণ

বিপন্ন চট্টগ্রাম বিশুদ্ধতায় উত্তরণ

পাঠকনন্দিত দৈনিক পূর্বকোণ গৌরবের ৩৪ পূরণ করে আজ ৩৫ বছরে পদার্পণ করলো। এই শুভদিনে পূর্বকোণের পাঠক, হকার, শুভানুধ্যায়ী, বিজ্ঞাপনদাতাসহ সবার জন্য রইলো আন্তরিক শুভেচ্ছা।

বরাবরই দৈনিক পূর্বকোণ বর্ষপূর্তির বিশেষ সংখ্যার বিষয় নির্বাচনে জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্টতাকেই প্রাধান্য দিয়ে আসছে। এবারও জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বিষয় নির্বাচন করা হয়েছে। এবারের বিষয় ‘বিপন্ন চট্টগ্রাম : বিশুদ্ধতায় উত্তরণ’। সুপ্রাচীন কাল থেকেই পাহাড়-নদী-সাগর বেষ্টিত চট্টগ্রাম অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যে প্রাচ্যের রাণী হিসেবে খ্যাত হয়ে আসছে। বিশ্বখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা এবং চিনা পরিব্রাজক হিউ যেন সাঙসহ অসংখ্য খ্যাতনামা বিশ্বপর্যটক তাঁদের ভ্রমণবৃত্তান্তে চট্টগ্রামকে স্বাস্থ্যকর-সমৃদ্ধ স্থান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান, সমৃদ্ধ জনসংস্কৃতি, সুলভ ও বিশুদ্ধ জীবন-উপকরণ, সুস্থ-সুন্দর জীবনধারা প্রভৃতি কারণে এ জনপদকে স্বর্গস্থানের সাথে তুলনা করেছেন অনেকে। ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে চট্টগ্রামই ছিলো একসময় পর্যটকদের প্রথম ও প্রধান পছন্দের গন্তব্য। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে চট্টগ্রামের সে গুরুত্ব ম্লান হতে চলেছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অঞ্চল, এমনকি বিশ্বের নানা দেশ থেকেও জীবিকার তাগিদে ছুটে আসছে জন¯্রােত। অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান হারে ছুটে আসা মানুষের চাপে ও ভারে ন্যুব্জ এই জনপদ নানা দূষণের শিকার। আর জনসংখ্যার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নানামাত্রিক দূষণ। নানা সেক্টরে প্রকট হচ্ছে সুশাসনের অভাব। কিন্তু এসব দিকে প্রয়োজনীয় নজর নেই নগরপ্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর। পরিবেশবিদ, পরিবেশকর্মী, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাবিদ এবং সচেতন নাগরিকরা সোচ্চারকণ্ঠ হলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও দায়িত্বশীলরা এ ব্যাপারে জনকাক্সক্ষা পূরণে তৎপর নয়। পরিণামে এক সময়ের ‘স্বর্গস্থান’ খ্যাত চট্টগ্রামের জনজীবন আজ বিপন্নতার দিকে হাঁটছে।

পানি ছাড়া জীবনের অস্তিত্ব কল্পনাই করা যায় না। সুস্থভাবে বাঁচতে হলে প্রতিদিন পরিমিত বিশুদ্ধ পানি পান করতে হয়। আবার দূষিত পানি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তাই সচেতন নাগরিক মাত্রই বিশুদ্ধ পানি পান করতে চান। কিন্তু এই নগরে বিশুদ্ধ পানির বড়ই অভাব। বিভিন্ন অনুসন্ধানী রিপোর্ট বলছে, জীবাণুযুক্ত ও মানহীন জারের পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে পানির বাজার। খোলা কলের দূষিত পানি ভরে বিক্রি ও বাজারজাত করছে একশ্রেণির অসৎ মানুষ, যা জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। এসব পানি পান করে অনেকেই দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছেন। সুপেয় পানির অভাবে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, কলেরা, জন্ডিস, আমাশয়, হেপাটাইটিস বি-ভাইরাস, চর্মরোগ ও মরণব্যাধি ক্যান্সারের মতো বড় রোগ-বালাই বাড়ছে। প্রশ্নটি হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কঠোর থাকলে কি বিশুদ্ধ পানির নামে দূষিত পানির এমন রমরমা বাণিজ্য চলতে পারতো?
বাযু ছাড়া জীবজগতের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। মহান সৃষ্টিকর্তা তাই জীবনধারনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অফুরন্ত নির্মল বায়ু দিয়ে রেখেছেন প্রকৃতিতে। কিন্তু দুঃখজনক এবং আতঙ্কজনক ব্যাপারটি হচ্ছে, জীবন ধারণের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি এখন এই জনপদে নানা দূষণের শিকার। যে বাতাস আমরা বুক ভরে নিয়ে থাকি তা ধীরে ধীরে বিষময় হয়ে উঠছে। বিশুদ্ধ বায়ুর অভাবে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে নানা প্রাণঘাতী রোগ-ব্যাধিতে। অপরিকল্পিত ও দীর্ঘসূত্রতার উন্নয়নসহ নানা কারণে চট্টগ্রাম মহানগর আজ মারাত্মক বায়ুদূষণের শিকার। কিন্তু দূষণ রোধে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে, রাস্তাঘাট ও নির্মাণাধীন বিভিন্ন স্থাপনার ধূলিকণা, সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, হাইড্রোকার্বন, কার্বন মনোঅক্সাইড, সিসা ও অ্যামোনিয়া নগরীর বায়ুকে প্রাণঘাতী করে তুলছে।

সড়কে সুশাসন প্রতিষ্ঠায়ও নেই জনকাক্সিক্ষত পদক্ষেপ। ফলে সড়ক ও সড়ক পরিবহন আইনের তোয়াক্কা করছে না কেউ। যানবাহনের দুরন্ত গতি, যত্রতত্র পার্কিং, ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে বাণিজ্য, যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা, যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, ওভারটেকিংসহ নানা অনিয়ম জুড়ে বসেছে সড়কে। ফলে, নিরাপদ সড়কের জন্যে আন্দোলন-সংগ্রাম অরণ্যরোদনে পরিণত। সুশাসনের অভাবে যানজটের পাশাপাশি থামছে না সড়কদুর্ঘটনা এবং মৃত্যুর মিছিলও। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সড়কদুর্ঘটনা ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেই চলেছে। এ বিষয়ে আর নির্লিপ্ত থাকার সুযোগ নেই। জনস্বার্থে এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতেই হবে।

নিরাপদ খাদ্যের অধিকার সব নাগরিকেরই ‘সাংবিধানিক অধিকার’। কিন্তু প্রতি পদেই লঙ্ঘিত হচ্ছে এ অধিকার। এখন অসাধু ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে মুনাফার পাহাড় গড়তে। একদিকে নানা কারসাজিতে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়ে ভোক্তার পকেট কাটছে, অন্যদিকে নকল-ভেজাল পণ্যে সয়লাব করছে বাজার। খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল, রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণ এবং নি¤œমানের খাদ্যের গায়ে প্রতারণাপূর্ণ লেবেল লাগিয়ে সাধারণ মানুষকে ঠকানোর প্রবণতা এখন বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নানা ঘাতকব্যাধিতেও আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু এ চিত্রের অবসানে সংশ্লিষ্ট সংস্থার নেই বলিষ্ঠ উদ্যোগ। এমন চিত্র স্বাস্থ্যবান জাতি গড়া এবং দেশের টেকসই উন্নয়নের অনুকূল নয়। আমরা মনে করি, মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কারও নেই। জনস্বার্থে এ বিষয়েও সরকারের কঠোর পদক্ষেপ জরুরি।

বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন সারাবিশ্বের কাছে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল। তবে টেকসই উন্নয়নের জন্যে সুস্বাস্থ্য এবং সুশিক্ষার বিকল্প নেই। কিন্তু চট্টগ্রামের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের বিদ্যমান চিত্র কোনো মতেই টেকসই উন্নয়নের অনুকূল নয়। এই দুই সেক্টরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে অনিয়ম-দুর্নীতি। মাঝেমধ্যে এই দুই খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বলিষ্ঠ উদ্যোগ নেয়ার কথা শোনা গেলেও বাস্তবে সবই ‘কথার কথা’ হিসেবেই গণ্য হয়। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের এমন চিত্র সুখকর নয়। এই চিত্রেরও ইতিবাচক বদলে মনোযোগ দিতে হবে জাতির এগিয়ে যাওয়ার স্বার্থে।
বর্ষপূর্তির আয়োজনে দৈনিক পূর্বকোণের প্রকাশমান সংখ্যাগুলোতে তুলে ধরা হচ্ছে, সুস্থ-সুন্দর জনজীবনের জন্য অপরিহার্য ছয়টি বিষয়Ñ বিশুদ্ধ পানি, বিশুদ্ধ বায়ু, নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ খাদ্য, সুস্বাস্থ্য এবং সুশিক্ষা বিষয়ে সঙ্কটচিত্রসহ বিশদ প্রতিবেদন এবং সমাধানের দিকনির্দেশনা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত। ফলে, সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছা থাকলে সমাধান-উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সহজ হবে। চট্টগ্রামকে জনবান্ধব স্মার্ট সিটিতে রূপান্তরের ঘোষণা এসেছে। আমাদের বিশ্বাস, এই ঘোষণা বাস্তবায়নেও দৈনিক পূর্বকোণের বর্ষপূর্তির আয়োজন সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী
১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০

The Post Viewed By: 55 People

সম্পর্কিত পোস্ট