চট্টগ্রাম বুধবার, ২৭ মে, ২০২০

ধুলোয় ধূসর নগর জীবন

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৬:৪৩ পূর্বাহ্ণ

ধুলোয় ধূসর নগর জীবন

প্রতিদিন নজুমিয়া হাট থেকে মোটরসাইকেল যোগে নিজ কর্মস্থল আসকারদিঘির পাড় আসেন সাংবাদিক সুজিত সাহা। আসার সময় তার কাঁধে একটি ব্যাগ থাকে। ওই ব্যাগে থাকে একজোড়া পোশাক। প্রতিদিন অফিসে এসে কাপড় বদলানো তার রুটিন কাজ। কারণ, বাসা থেকে যে পোশাক পড়ে বের হন, তার উপর ধূলির আস্তরণ পড়ে ধূসর হয়ে যায়। তাই ব্যাগে করে কাপড় আনতে বাধ্য হন তিনি। শুধুমাত্র সাংবাদিক সুজিত সাহা নন। এই দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে যাতায়াতকারি হাজারো মানুষ। মাস্ক হয়ে গেছে নগর জীবনের অনুষঙ্গ।

প্রাচ্যের রাণী বন্দর নগরী ধূলাবালির কারণে প্রতিনিয়ত ধূসর হচ্ছে। এই নগরে এখন সাদা পোশাক পরে রাস্তায় বের হলে তা যেমন ধূসর হয়ে যায়। তেমনি অন্য রঙের পোশাক পরে বের হলেও ধূলি পড়ে তার রং পাল্টে যায়। মারাত্মক বায়ুদূষণের কারণেই এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন সাধারণ মানুষ। এ জন্য নগরীর বাসিন্দারা দুষছেন উন্নয়ন কর্মকা-ে নিয়োজিত সেবা সংস্থাগুলোকে। তবে সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নানা বিরূপ মন্তব্য এবং ক্ষোভ প্রকাশ করছে নগরবাসী।
সম্প্রতি বায়ু দূষণরোধে করণীয় নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের দেয়া নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নির্মাণকাজের চারপাশ ঢেকে রাখা ও পানি ছিটানো, রাস্তা খোঁড়ার সময় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঢেকে রাখা, স্টিল, রি-রোলিং মিলস ও সিমেন্ট কারখানাগুলোয় বস্তুকণা নিয়ন্ত্রণমূলক যন্ত্রপাতি ব্যবহার ও ধুলাবালি কমাতে বাড়ির চারপাশে সবুজায়ন করা, ইটভাটায় পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি ব্যবহার, গাড়ি ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করা, যানজট এড়াতে ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং দূষণরোধে নিয়মিত মেইনটেনেন্স করা।

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরীর পরিচালক আজাদুর রহমান মল্লিক বলেন, এই শহরের বায়ুদূষণের জন্য বিশেষ করে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকা-ে নিয়োজিত সেবা সংস্থাগুলো যেমন দায়ী, তেমনি গাড়ির কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়া ট্রাফিক বিভাগ ও বিআরটিএ’রও দায় আছে। এই সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে সব সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে।

ঢাকায় উচ্চ আদালতের নির্দেশে পরিবেশ অধিদপ্তর উন্নয়ন কর্মকা-ের নামে বায়ুদূষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানা করলেও চট্টগ্রামে সেই ধরনের কোন উদ্যোগ নেই বললেই চলে। এবারের শুষ্ক মৌসুমে বন্দর নগরীর বাতাসে ভাসমান বস্তুকণার পরিমাণ গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বৃষ্টির দিন ছাড়া এই শহরের বাতাস কোন দিনই স্বাস্থ্যকর ছিল না। তবুও নির্বিকার দায়িত্বশীল সংস্থা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, সিডিএ এবং পরিবেশ অধিদপ্তর।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়রা বলছেন, বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় শীতকালে শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টি না হওয়া এবং ইটভাটা ও গাড়ির কালো ধোঁয়া বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। তবে এই নগরীতে বায়ুদূষণের প্রধানতম কারণ হচ্ছে বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়নমূলক কর্মকা-। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সড়ক সংস্কার, সম্প্রসারণ ও রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে বাতাসে ধূলিকণার পরিমাণ বেড়েছে, যা ধুলোবালির সৃষ্টি করে।
বিশেষ করে নগরীর আরকান সড়ক, বহদ্দারহাট, চকবাজার, জামালখান, নন্দনকানন, আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, হালিশহর, বাকলিয়া, পোর্ট কানেকটিং রোড,

বন্দর, পতেঙ্গা ইপিজেড থানা এলাকাসহ অনেক জায়গায় অসহনীয় বায়ু দূষণ হচ্ছে। আবার ড্রেন সংস্কার বা নালা-নর্দমা পরিষ্কারের সময় তোলা মাটি নালার পাড়েই দিনের পর দিন ফেলে রাখা হয়। সেখান থেকেও ধূলার সৃষ্টি হচ্ছে। মূলত চট্টগ্রাম ওয়াসার পাইপলাইন সংস্কারের কারণে খোঁড়াখুঁড়ি, সিডিএ’র এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, সিটি কর্পোরেশনের চলমান সড়ক উন্নয়ন কাজের কারণেই নগরীর বাতাসে ধুলোবালি অর্থাৎ ভাসমান বস্তুকণার পরিমাণ বেড়ে গেছে। এসব সড়কে চলাফেরা রীতিমত দায় হয়ে পড়েছে। বাসা থেকে বের হলে মুখে মাস্ক লাগাতে হচ্ছে।

সচেতন মহলের অভিমত, সামগ্রিকভাবে সারাদেশের মতো চট্টগ্রামের পরিবেশ দূষণের মাত্রা ক্রমেই ভয়ানক পর্যায়ে যাচ্ছে। শুকনো মৌসুমে সড়কে ধুলোর দাপট কমাতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন সুইপিং গাড়ি কিনলেও তা কোন কাজে আসছে না। এমনকি তারা সড়কে কোনও সময় পানি পর্যন্ত ছিটায়নি।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, শীত মৌসুমের শুরুতেই বাতাসে বস্তুকণার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। স্বাভাবিক নিয়মে যার সহনীয় পরিমাণ ২০০ এসপিএম হলেও এখন তা ৪০০-তে গেছে। নগরীতে চলাচলকারী যানবাহনের প্রায় ৩৫ শতাংশই ফিটনেসবিহীন। এসব যানবাহন কালো ধোঁয়া সৃষ্টি করছে।

The Post Viewed By: 79 People

সম্পর্কিত পোস্ট