চট্টগ্রাম রবিবার, ৩১ মে, ২০২০

ধুলোয়-ধূসর নান্দনিক স্থাপনা এবং বৃক্ষরাজি

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৬:৪৩ পূর্বাহ্ণ

চসিকের তিনটি ঝাড়–দার গাড়িই নষ্ট

ধুলোয়-ধূসর নান্দনিক স্থাপনা এবং বৃক্ষরাজি

নগরজুড়েই বেড়েছে ধূলাবালি। নগরীর কিছু কিছু এলাকায় মাত্রাতিরিক্ত ধুলোর কারণে বাসা থেকে বের হওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ’র মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার পর ধুলোর পরিমাণ আরো বেড়ে গেছে। এছাড়া চসিকের অধীনে চলছে কয়েকটি সড়কের উন্নয়নকাজ। ধুলো কুড়ানোর জন্য চসিকের তিনটি সুইপিং গাড়ি বসে বসেই নষ্ট হয়ে গেছে। অপরদিকে, সৌন্দর্য-বর্ধনের স্থাপনাগুলো এবং বৃক্ষরাজি ধুলোয় ধূসর হয়ে গেছে।

চসিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালে চট্টগ্রাম ভেন্যুতে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠানের আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বিদেশিদের কাছে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের ঐতিহ্যগত সৌন্দর্য তুলে ধরতে ৫৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বরাদ্দ প্রদান করে। ২০১৪ সালে মন্ত্রণালয় একই কাজে আরও ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। ওই প্রকল্পের অধীনে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মোড়গুলোয় বসানো হয় রয়েল বেঙ্গল টাইগার, বিমানের ভাস্কর্য, ঘোড়সওয়ারি, ক্রিকেটারের ভাস্কর্য, ম্যুরালসহ রোপণ করা হয় সবুজ-গাছপালা। ভাস্কর্য ও সবুজ সৌন্দর্য ধরে রাখতে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার পরিচর্যা ও ডিভাইডারের গাছ পানি দিয়ে পরিচর্যা করার কথা থাকলেও তা যথাযথ বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে ডিভাইডারের সবুজ বৃক্ষ হয়ে গেছে ফ্যাকাশে, মরে গেছে অনেক গাছ। বাঘের গায়ে জমেছে বালু। বিমানের ওপর পড়েছে ধুলোবালির আস্তরণ।

রূপনগর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, বাসা থেকে বেরিয়ে ৩০ মিনিট পর ফিরে গেলেও গোসল করতে হয়। মাত্রাতিরিক্ত ধুলোর কারণেই এ অবস্থা। ধুলোবালির কারণে আমাদের বাসার বাইরের দৃশ্যও পরিবর্তন হয়ে গেছে। চেনায় যায় না। ধুলোবালির কারণে আত্মীয়স্বজনও বাসায় আসতে চায় না।

নগরীর বহদ্দারহাট থেকে আগ্রাবাদে কর্মস্থলে আসেন ব্যাংকার আবদুল আলিম। তিনি বলেন, গাড়িতে আসা-যাওয়ার সময় সড়কে যেভাবে ধুলোবালি উড়ে, মুখে মাস্ক দিয়েও ঠেকানো যায় না। শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। কিছুদিন ধরে শ্বাসকষ্টেও ভুগছি।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক অধ্যাপক শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বাসনা মুহুরী বলেন, শুষ্ক মৌসুমে এই শহরে ধুলোবালি বেশি থাকে। এ কারণে শিশুদের শ্বাসতন্ত্রসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপও বেড়েছে। ব্রঙ্কাইটিস, শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ, অ্যাজমাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে নগরবাসী।
ধুলোবালির অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে নগরবাসীকে রক্ষায় পাঁচ বছর আগে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে দুইটি ‘সুইপিং’ ঝাড়–দার গাড়ি দিয়েছিল পরিবেশ মন্ত্রণালয়। স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধূলাবালি পরিষ্কারে সক্ষম প্রায় দুই কোটি টাকা দামের গাড়ি দুইটি বর্তমানে নষ্ট। এছাড়া চসিকের নিজস্ব অর্থায়নে সংগৃহীত আরেকটি সুইপিং গাড়িও নষ্ট হওয়ায় নিলামে বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে।

এদিকে, আর্থিক টানাপোড়েন এবং অন্তর্কোন্দলের কারণে সড়কে নিয়মিত ঝাড়– দেয় না বলে অভিযোগ আছে চসিকের বিরুদ্ধে। পরিচ্ছন্ন বিভাগের অভিযোগ, সড়ক পরিষ্কার করার জন্য নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে অন্তত প্রতিমাসে ২০০টি হুইলবেরু প্রয়োজন। কিন্তু তারা পেয়েছে গত দুই বছরে ২০০টি। সেবকরা কিভাবে সড়ক থেকে বালি এবং অন্যান্য আবর্জনা তুলে নেবে। তাদের অভিযোগের তীর চসিকের যান্ত্রিক (প্রকৌশল) বিভাগের দিকে। একাধিক পরিচ্ছন্নকর্মীর সাথে আলাপকালে তারা জানান, সড়ক ঝাড়– দিয়ে আবর্জনা এবং বালি এক জায়গায় জড়ো করে তা হুইলবেরুতে তুলে আবর্জনার গাড়িতে নিয়ে যেতে হয়। যেহেতু হুইলবেরু নেই, তাই সেবকরা আবর্জনা গাড়ির কাছে নিয়ে যেতে পারে না। ঝাড়– দিয়ে একস্থানে জড়ো করা বালি এবং আবর্জনা যানবাহনে বাতাসে তা ফের ছড়িয়ে পড়ে।

চসিকের তিনটি গাড়িই নষ্ট :
২০১৩ সালের ৮ জুন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সড়কের ধূলাবালি পরিষ্কারের জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে দুটি সুইপিং গাড়ি দিয়েছিল পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। প্রতিটি গাড়ির মূল্য ৮৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা। তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম গাড়িগুলো বুঝে নিযেছিলেন তৎকালীন পরিবেশ ও বনমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের কাছ থেকে। এর আগে ২০১০-১১ অর্থবছরে ৫০ লাখ ৩০ হাজার টাকায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন একটি সুইপিং গাড়ি কিনেছিল। গাড়িগুলি প্রথমদিকে কিছুদিন ব্যবহার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে গাড়িগুলোর তেমন একটি ব্যবহার হতো না। এর কারণ হিসেবে প্রায় সময় চসিকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলতেন, গাড়িগুলো বাংলাদেশে ব্যবহার উপযোগী নয়। এক্ষেত্রে দাবি করা হতো, গাড়িগুলো মসৃণ পিচঢালা সড়কের হালকা ধুলোবালি পরিষ্কার উপযোগী। কিন্তু চট্টগ্রামের সড়ক ও ফুটপাতে যেভাবে ধূলাবালির ভারি আবরণ পড়ে থাকে, গাড়িগুলো দিয়ে এসব পরিষ্কার কঠিন।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) সুদীপ বসাক বলেন, তিনটি সুইপিং গাড়িই নষ্ট। এর মধ্যে একটি গাড়ি ব্যবহারের অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে। সেটা নিলাম দেয়ার পর্যায়ে আছে। তিনি দাবি করেন, পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া গাড়িগুলো এখানকার ধুলোবালি পরিষ্কার উপযোগী নয়।

এদিকে নিয়মিত সড়ক পরিষ্কার করা হয় দাবি করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শফিকুল মান্নান ছিদ্দিকী জিসু বলেন, যেখানে নির্মাণ কাজ চলছে সেখানে ধুলোবালি আছে। প্রতিদিন তাদের ৭০০ জন ঝাড়ুদার রাস্তা থেকে ধুলোবালি পরিষ্কার করছে উল্লেখ করে বলেন, তারা নিয়মিত রাস্তা পরিষ্কার করেন। তাছাড়া উন্নয়ন কাজের জন্য সাময়িক ভোগান্তি হবে। যা বৃহত্তর স্বার্থে মেনে নিতে হবে।
চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামশুদ্দোহা বলেন, সড়কের ধুলোবালি পরিষ্কারের জন্য আমাদের দুটি সুইপিং গাড়ি আছে। প্রতিটি গাড়িতে সামনে পেছনে দুটি ইঞ্জিন। এগুলো ডিজেলচালিত হওয়ায় খরচও দ্বিগুণ। গাড়িগুলো উন্নত দেশের নিরিখে তৈরি হওয়ায় আমাদের ধুলোবালির দেশে পরিচালনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এ ছাড়া নগরের সৌন্দর্যবর্ধন খাতে চসিকের পৃথক কোনো বড় বাজেটও নেই। তাই নিয়মিত ব্যবহার হচ্ছে না গাড়িগুলো। ফলে নান্দনিক স্থাপনাগুলোর পরিচর্যা কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে।

The Post Viewed By: 42 People

সম্পর্কিত পোস্ট