চট্টগ্রাম বুধবার, ০৩ জুন, ২০২০

বিশ^-উষ্ণায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে ঘূর্ণিঝড়

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ১২:৪৮ পূর্বাহ্ণ

ইফতেখারুল ইসলাম

বিশ^-উষ্ণায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে ঘূর্ণিঝড়

এতো বেশি ঝড়ের জন্য বিশে^র উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা। একই সময়ে বিশে^ একাধিক ঝড়ও তৈরি হচ্ছে। বিশে^র উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং এল-নিনোর প্রভাবের কারণে সাগরের পরিবেশ অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এসব কারণে দ্রুত তৈরি হচ্ছে ঝড়। তার অনেকগুলো পরবর্তীতে বড় হয়ে যাচ্ছে। আবার অনেকগুলো আর বাড়ে না। যতদিন পর্যন্ত এসব সাগরের উষ্ণতা যথেষ্ট মাত্রায় নিচে নেমে না আসবে, ততদিন এসব ঝড় তৈরি হবে।
সাইক্লোনের পরিবেশ তৈরির একটি বড় কারণ সাগরের ওপরের তাপমাত্রা ২৬.৫ বা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকা। এখন বিশে^র অনেক এলাকার সমুদ্রেই এমনটা দেখা যাচ্ছে।

প্রকৃতি ও পরিবেশের নানা বিপর্যয় ও অসঙ্গতি বিশ^ব্যাপী উত্তপ্ত আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতি ও পরিবেশের আচার-আচরণে অস্বাভাবিকতা বাড়ছে। শীত, গ্রীষ্ম, বায়ুপ্রবাহ, ঝড়ঝঞ্ঝা, খরা, অতিবৃষ্টিÑ এসব যেন তাদের চিরাচরিত নিয়ম আর মানছে না, অর্থাৎ এসবের সময়কাল, ধরন, তীব্রতা প্রভৃতি ক্ষেত্রে নিদারুণ অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। এসব দুর্যোগ এত বেড়েছে যে, বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। প্রযুক্তিগত উন্নতির কারণে গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়ার বিভিন্ন প্রভাব ওজোনস্তরের অবক্ষয় ও অতিবেগুনি রশ্মির আগমনজনিত ক্ষয়-ক্ষতির প্রভৃতি বিষয়ে জানা সম্ভব হয়েছে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এল-নিনো তৈরি হলে বিশে^র অন্যান্য এলাকায় সাগরের উষ্ণতা কমে যাবে। তখন এসব সাগরে ঝড়ের প্রবণতাও কমবে। তবে সেটি বিশে^র উষ্ণতা বৃদ্ধিকে আবার প্রভাবিত করবে। বিশেষ করে এল নিনো (পেরুর উপকূলে সমুদ্রের উপরের পানি গরম হয়ে যাওয়া, যা সেখানে মেঘ সৃষ্টি আর প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়, দুই বা সাত বছর পরপর তৈরি হয়) তৈরি হলে সেটি বিশে^র অন্যান্য এলাকায় একযোগে ঝড়ের প্রবণতা অনেক কমে যাবে। সমুদ্রের উষ্ণ-পানির কারণে বায়ু উত্তপ্ত হয়ে হঠাৎ করে এসব ঝড় তৈরি হয়। তখন তুলনামূলক উষ্ণ বাতাস হালকা হয়ে যাওয়ার কারণে উপরে উঠে যায়, আর ওপরের ঠা-া বাতাস নিচে নেমে আসে। তখন নীচের বায়ুম-লের বায়ুর চাপ কমে যায়। তখন তখন আশেপাশের এলাকার বাতাসে তারতম্য তৈরি হয়। সেখানকার বাতাসের চাপ সমান করতে আশেপাশের এলাকা তৈরি প্রবল বেগে বাতাস ছুটে আসে। আর এ কারণেই তৈরি হয় ঘূর্ণিঝড়। এর ফলে প্রবল বাতাস ও ¯্রােত তৈরি হয়। যখন এই বাতাসে ভেসে ঝড়টি যখন ভূমিতে চলে আসে, তখন বন্যা, ভূমিধস বা জলোচ্ছ্বাস তৈরি করে।

তবে বিশে^র বিভিন্ন অঞ্চলে এগুলোকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। যেমন আটলান্টিক, ক্যারিবিয়ান সাগর, মধ্য ও উত্তরপূর্ব মহাসাগরে এসব ঝড়ের নাম হ্যারিকেন। উত্তর পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে সেই ঝড়ের নাম টাইফুন। বঙ্গোপসাগর, আরব সাগরে এসব ঝড়কে ডাকা হয় সাইক্লোন নামে।
গত ২০০ বছরে বাংলাদেশ-ভারত এলাকায় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে প্রায় ৭০টি।আর১৯৭০ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত ৪৯ বছরে ঘূর্ণিঝড় কম-বেশি আঘাত হানে ৩২টি। ১৯৯১ ও ২০০৪ সালের পর থেকে ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা ও জনমনে এটার আতংকও তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। ২০১৭ সালের ২৩ মে ঘূর্ণিঝড় মোড়ার আঘাতে কক্সবাজারের লবণ চাষীদের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হলেও ঘূর্ণিঝড়ে খুব একটা প্রাণহানি ঘটেনি। তবে ২০১৬ সালের ২১ মে আঘাত হানা শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর ক্ষত না শুকাতেই তিন বছরের মাথায় গত ৯ নভেম্বর ২০১৯ বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের ১৬টি জেলাসহসুন্দরবন ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। এতে প্রাণহানি ঘটে ১৩ জন মানুষের। ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে ফসলি জমি, আমন ধানসহ শীতকালিন সবজির।
বিশেষজ্ঞদের মতে সুন্দরবনের কারণে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ কম ছিল। তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার ক্ষেত্রে অবদান রাখা সুন্দরবনকে রক্ষা করার ব্যাপারে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।
এদেশের মানুষ ঘূর্ণিঝড়ের সাথে প্রথম পরিচিত হয় ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর। এটি আঘাত হানে চট্টগ্রামে। ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। এই ঘূর্ণিঝড়ের ছোবলে প্রাণহানি ঘটে প্রায় ৫ লক্ষাধিক মানুষের। এর ১৫ বছর পর ১৯৮৫ সালের ২৫ মে সন্দ্বীপের উড়ির চরে আঘাত হানে আরেকটি ঘূর্ণিঝড়। এতে প্রাণ হারান প্রায় ১১,০৬৯ জন মানুষ। আর উপকূলবাসীর ঘর-বাড়ি ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ৯৪,৩৭৯টি। মাত্র তিন বছর পর ১৯৮৮ সালের ২৯ নভেম্বর আঘাত হানে আরেকটি ঘূর্ণিঝড়। সরকারি হিসেবে প্রাণ হারান ৫,৭০৮ জন মানুষ। এর মাত্র তিন বছর পর ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল আঘাত হানে অপর একটি ঘূর্ণিঝড়। এটি মূলত আঘাত হানে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপসহ উপকূলীয় এলাকায়। এর কারণে তছনছ হয়ে যায় সন্দ্বীপসহ উপকূলবাসীর জনজীবন। এতে সরকারী হিসেবে এক লাখ ৩৮ হাজার মানুষ নিহত হন। তবে বেসরকারি হিসেবে ওই ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারান প্রায় তিন লক্ষাধিক মানুষ। এরপর ১৯৯৭ সালের ১৯ মে আরেকটি ঘূর্ণিঝড় হয়। এটি মূলত আঘাত হানে চট্টগ্রামের সীতাকু-ে। এতে মারা যায় প্রায় ১৫৫ জন মানুষ।

দীর্ঘ ৩৮ বছরে আরব সাগর, ভারত ও বঙ্গপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়গুলোর কোন নামকরণ ছিলনা। ২০০৪ সালে এসে এশিয়ার ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার, মালদ্বীপ, ওমান, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও শ্রীলংকাসহ ৮টি দেশ নিয়ে দিল্লির মেট্রোলজি সেন্টারের সমন্বয়ে এই ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ শুরু হয়। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়টির নাম সিডর। এতে ৬,৩৬৩ জন মানুষ মারা যায় বলে জানা যায়। এভাবে ২০০৮-এ রেশমা, এর মাত্র এক বছর পর ২০০৯ সালের ২৫ মে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আয়লা। এতে বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমের মোট ১৫টি জেলাতে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। প্রাণ হানিসহ প্রায় দুই লক্ষ ঘর-বাড়ি উড়ে যায় সে সময়। এরপর ২০১৩ সালের ১৬ মে মহাসেন, ২০১৬ এর ২১ মে রোয়ানু ও ২০১৭ এর ২৩ মে ঘূর্ণিঝড় মোড়া ও সব শেষে ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর দেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের ১৬টি জেলাসহ সুন্দরবন ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আঘাত হানে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। এতে প্রাণহানি ঘটে ১৩ জন মানুষের। ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে ফসলি জমি, আমন ঘান ও শীতকালিন সবজির। আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন লাখো মানুষ।
আবহাওয়া ও জলবায়ুবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাগরে এখন ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হচ্ছে। আর এপ্রিল-মে ও অক্টোবর-নভেম্বর মাসে এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা আরো বাড়ছে।

এদিকে পরবর্তী ঘূর্ণিঝড়টির নাম হবে পবন। এই নামটি শ্রীলংকার দেওয়া। আর এর পরের ঘূর্ণিঝড়টির নাম হবে আম্পান এটি থাইল্যান্ডের দেয়া। ৮টি দেশের সমন্বয়ে এটিও ঠিক করা আছে। বিশে^র অন্যান্য অঞ্চলে আরো আগে থেকেই ঘূর্ণিঝড়ের নাম করণের প্রচলন রয়েছে। কিন্তু এশিয়াতে এটা শুরু হয় গত ১৫ বছর ধরে। এই নামগুলো ঠিক করা হয় দেশের সংস্কৃতি, ভাষাগত মিল, ছোট ও সহজ উচ্চারণকে ঘিরে।

The Post Viewed By: 132 People

সম্পর্কিত পোস্ট