চট্টগ্রাম বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

পাঁচ বছর পর ব্লক ব্যবহার সরকারি নির্মাণকাজে

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৬:৪৩ পূর্বাহ্ণ

পাঁচ বছর পর ব্লক ব্যবহার সরকারি নির্মাণকাজে

থাকবে না আর পোড়ানো ইট ঁ চট্টগ্রামে ইটভাটা মোট ৪০৫টি ঁ পরিবেশ ছাড়পত্র আছে ৫০টির ঁ বাকি ৩৫৫টি ইটভাটাই অবৈধ ঁ বায়ুদূষণের ৫৮% উৎস ইটভাটা

চলতি অর্থ বছর থেকে সরকারি নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কার কাজে ভবনে দেয়াল, সীমানা প্রাচির, হেরিং বোন বন্ড রাস্তা এবং গ্রাম সড়ক টাইপ ‘বি’ এর ক্ষেত্রে ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লকের ব্যবহার অন্তত ১০ শতাংশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে তা শতভাগ নিশ্চিত করা হবে। সম্প্রতি এনিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রণালয়। কারণ পোড়ামাটির ইটে কৃষিজ জমির বিশেষ করে টপ সয়েল নষ্ট হচ্ছে, ছাই-ধোঁয়ায় আশপাশের সবাই নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদের পাশাপাশি বায়ু দূষণ কমাতে কৃষি জমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহার করে পোড়ামাটির ইটের ব্যবহার থেকে সরে এসে আগামী পাঁচ বছরে নির্মাণ কাজে ধাপে ধাপে পরিবেশবান্ধব ইটের শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মল্লিক আনোয়ার হোসেন বলেন, একটা কর্মপরিকল্পনা করা হয়েছে। এটা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। ২০২৫ সালের মধ্যে লক্ষ্য পূরণ হবে।

পরিবেশ অধিপ্তর চট্টগ্রামের তথ্যমতে, জেলার ১৫ উপজেলায় পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে ইটভাটা রয়েছে ৪০৫টি। এরমধ্যে পরিবেশ সংক্রান্ত লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ৫০টির। ৩৫৫টি ইটভাটাই লাইসেন্স ছাড়া ইট প্রস্তুত করে আসছে। অর্থাৎ ৮০ শতাংশ ইটভাটাই অবৈধভাবে ইট উৎপাদন করে আসছে।
২০১৩ সালের ৫৯ নং আইনে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন সংক্রান্ত কর্মকা- নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত্র আইনের ৪ নং ধারায় লাইসেন্স ব্যতীত ইট তৈরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আপাতত বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, ইটভাটা যে জেলায় অবস্থিত সেই জেলার জেলা প্রশাসকের নিকট হইতে লাইসেন্স গ্রহণ ব্যতিরেকে, কোন ব্যক্তি ইটভাটায় ইট প্রস্তুত করিতে পারবে না। এ আইনে বলা হয়েছে, লাইসেন্স ছাড়া ইট উৎপাদন করলে অনধিক এক বছরের কারাদ- বা অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ৪০৫ ইটভাটার মধ্যে পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়েছিলেন ২৬২টি ভাটার মালিক। ১৪৩টি ভাটার মালিক ছাড়পত্র নেননি। এরমধ্যে ১২০ ফুট উচ্চতার চিমনি রয়েছে ২৮৩টি ভাটার। এই ধরনের চিমনিধারী ইটভাটাগুলো আধুনিক প্রযুক্তিসম্মত নয় বিধান পরিবেশ আইনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরিবেশ আইনে অনুমোদিত আধুনিক প্রযুক্তি জিগজ্যাগ চিমনি রয়েছে ১১৯টির। উন্নতমানের অত্যাধুনিক হাইব্রিড হফম্যান কিলনধারী ভাটা রয়েছে মাত্র একটি ও অটো টানেল কিলন ভাটা রয়েছে দুটি। পরিবেশ আইনের ৪ উপধারায় এসব ইটভাটাকে আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটা হিসেবে চিহিৃত করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, পরিবেশসম্মত আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটা রয়েছে ১২২টি। ২৮৩টি ইটভাটা পরিবেশসম্মত নয়। ২০১৪ সালের ৩০ জুনের পর থেকে ৮০-১২০ ফুট উচ্চতার চিমনিধারী ইটভাটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ ৭০ শতাংশ ইটভাটাই আধুনিক প্রযুক্তিসম্মান নয়।
অথচ, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩-এ (যা ১ জুলাই ২০১৪ থেকে কার্যকর) বলা হয়েছে, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের স্বার্থে আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটা অর্থাৎ জিগজ্যাগ কিলন, হাইব্রিড হফম্যান কিলন, ভার্টিক্যাল শ্যাফট ব্রিকস কিলন, টানেল কিলন বা অনুরূপ উন্নততর কোনো প্রযুক্তির ইটভাটা স্থাপন করতে হবে।

এছাড়াও ইটপোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইনের ৮ ধারায় রয়েছে, আবাসিক, জনবসতি, সংরক্ষিত, বাণিজ্যিক এলাকা, অভয়ারণ্য, বাগান বা জলাভূমি, কৃষি জমি, পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন সদরের এক কিলোমিটার ও বনভূমি, জলাভূমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দুই কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। এ আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদ- ও ৫ লাখ টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িতের বিধান রয়েছে।
কিন্তু সরেজমিন দেখা যায়, আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে আবাসিক-জনবসতি এলাকা, ফসলি জমি, বনভূমি ও নদীর তীরে গড়ে উঠেছে বহু ইটভাটা। বছরের পর বছর চলে আসছে অবৈধ এসব ইটভাটা।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে এসব অবৈধ ইটভাটা চলে আসছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে উপজেলা প্রশাসন ইটভাটার মালিকদের কাছ থেকে সুবিধা নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
পরিবেশ আইনে উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তির পরিবেশ উপযোগী ইটভাটা ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি বলতে হাইব্রিড হফম্যান কিলন, জিগজ্যাগ কিলন, ভারটিক্যাল স্যাফট কিলন, টানেল কিলন ইটভাটা ব্যবহার করতে হবে। এই জাতীয় ইটভাটা রয়েছে ১২২টি। অর্থাৎ ৩০ শতাংশ ইটভাটা আধুনিক প্রযুক্তিধারী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, আপাতত অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার কোনো উদ্যোগ নেই। লাইসেন্স না থাকায় সরকার প্রতিবছর বড় ধরনের রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি বলেন, লাইসেন্স না থাকায় নবায়ন ফি জমা নেয়া হবে। নবায়ন না হলে তো আর রাজস্ব আদায় হবে না।
পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, জেলার রাউজানে ইটভাটা রয়েছে ৪৫টি। এরমধ্যে বৈধ রয়েছে মাত্র একটি। ফটিকছড়িতে রয়েছে ৫৬টি। বৈধ ভাটা রয়েছে মাত্র দুটি। সাতকানিয়ায় ভাটা রয়েছে ৬২টি। বৈধ ভাটা রয়েছে ১২টি। হাটহাজারীতে ভাটা রয়েছে ৬০টি। বৈধ ভাটা রয়েছে ১০টি। রাঙ্গুনীয়ায় ৭২টি ভাটার মধ্যে বৈধ হচ্ছে মাত্র একটি। চন্দনাইশে ৩০টি ভাটার মধ্যে বৈধ ভাটা রয়েছে তিনটি। লোহাগাড়ায় ২৫টি ভাটার মধ্যে বৈধ কোনো ভাটা নেই। আনোয়ারায় চারটি ইটভাটার মধ্যে বৈধ ভাটা হচ্ছে একটি। বাঁশখালীতে চারটি ভাটার মধ্যে সবকটিই অবৈধ। সন্দ্বীপে তিনটি ভাটার মধ্যে একটি বৈধ ভাটা রয়েছে। মিরসরাইয়ে ১৪টি ভাটার মধ্যে ১০টি হচ্ছে বৈধ ভাটা। সীতাকু-ে চারটি ভাটার মধ্যে চারটিই অবৈধ। বোয়ালখালীতে আটটি ভাটার মধ্যে সাতটি হচ্ছে অবৈধ। পটিয়ায় ৫টি ইটভাটার মধ্যে বৈধ হচ্ছে একটি। কর্ণফুলী উপজেলায় ১২টির মধ্যে ৭টি বৈধ।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মল্লিক আনোয়ার হোসেন বলেন, চলতি অর্থবছর থেকে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। ইতোমধ্যে বায়ুদূষণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়েছে। সভার পরই প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রণালয়। অধিদপ্তর জনসচেতনতা তৈরির জন্য গণবিজ্ঞপ্তিও জারি করেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসেবে বাংলাদেশে বায়ুদূষণের অন্যতম উৎস ইটভাটা। এই উৎস থেকেই প্রায় ৫৮ শতাংশ দূষণ ঘটছে। আর এ দূষণ রোধে আদালতের আদেশে দূষণবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সেই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব ব্লক ইট ব্যবহারের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন আইনের ক্ষমতা বলে মাটির ব্যবহার ধীরে ধীরে কমানোর উদ্দেশ্যে ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লক ব্যবহারে কর্মপরিকল্পনা ও লক্ষ্যমাত্রা বাধ্যতামূলক করা হল। তবে সড়ক, মহাসড়কের বেজ ও সাব-বেজ নির্মাণ, মেরামত, সংস্কারে এ নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে না বলেও জানানো হয় ওই প্রজ্ঞাপনে।

পরিবেশবান্ধব ব্লক ইট নিয়ে মল্লিক আনোয়ার বলেন, পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে ব্লক ইট তৈরিতে কোনো ফায়ারিং লাগে না, গাছ লাগে না। বালি ও একটা কেমিকেল দিয়ে আর কমপ্রেশার দিয়ে তেরি করা হয়। দেশের মধ্যেই কিছু প্রতিষ্ঠান এ ধরনের ইট উৎপাদন শুরু করেছে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি হওয়ায় দূষণ অনেকাংশেই কম হবে। ইটের বদলে ব্লক ব্যবহার উৎসাহিত করতে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন-২০১৯ এ বছর সংসদে পাস হয়।
দেশের ৬৪ জেলায় বর্তমানে ৮ হাজার ৩৩টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে পরিবেশগত ছাড়পত্র পেয়েছে ৫ হাজার ২২৫টি। ছাড়পত্র নেই ২ হাজার ৫১৩টি ইটভাটার। অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করছে ৫ হাজার ৭৯৮টি ইটভাটা। আর পরিবেশসম্মত চিমনি ব্যবহারে ইট তৈরি করছে ৭২ শতাংশ ইট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান।

অর্থ বছর ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা
২০১৯-২০ ১০%
২০২০-২১ ২০%
২০২১-২২ ৩০%
২০২২-২৩ ৬০%
২০২৩-২৪ ৮০%
২০২৪-২৫ ১০০%

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 236 People

সম্পর্কিত পোস্ট